
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্ট উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনেই উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চারতলা একটি রিসোর্ট ভবন। ভবনটি নির্মাণে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন মালিক শহিদুল হক।
সোমবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে ইনানী সৈকত এলাকায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। এতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।
অভিযানের শুরুতে রিসোর্ট ভবনের নিচতলা ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর ভেঙে ফেলা হয়। পরে ভবনের কাচের গ্লাস ভেঙে মূল কাঠামোর পিলার গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় জমে।

কউক কর্মকর্তারা জানান, ভবনটি নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলতে মালিকপক্ষকে চার দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, নোটিশের পরও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ না থাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।

তবে ভবনমালিক শহিদুল হক দাবি করেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন তিনি। সম্প্রতি ভবনটির নিচতলায় দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই রিসোর্টটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
শহিদুল হকের ভাষ্য, চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছেন তিনি। ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রয়েছে। তবে সেসব কাগজপত্র আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ১৭ অক্টোবর মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভের পাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। অধিকাংশ স্থাপনারই প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে দাবি তাঁর।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় এক হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সেখানে একের পর এক স্থাপনা তৈরি হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে নোটিশ দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে কোনো অবৈধ স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এ কারণে মেরিন ড্রাইভের শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ কউকের অনুমোদন পায়নি।
তিনি আরও বলেন, কউকের অনুমোদন না থাকলে ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কাগজপত্র রয়েছে, কিন্তু অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
উচ্ছেদ অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান। তিনি বলেন, মেরিন ড্রাইভে অপরিকল্পিতভাবে অনেক রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনায় কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার অভিযোগে সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, তাদের সমিতিতে ১৮৭ জন সদস্য রয়েছেন। সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেল ও গেস্টহাউসের অনুমোদন রয়েছে। তবে সমিতির বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্রের বিষয়ে তার জানা নেই।
পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


