
কালোবাজারি ও টিকিট জালিয়াতি ঠেকাতে সিলেটে কঠোর হচ্ছে প্রশাসনের নজরদারি। আগামী ১২ অক্টোবর থেকে টিকিটের নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নাম না মিললে কোনো যাত্রীকে ট্রেনে ভ্রমণ করতে দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে রেলস্টেশনে বিশেষ অভিযান চালিয়ে অনলাইনে কাটা টিকিটের সঙ্গে যাত্রীদের পরিচয়ের অসংগতি পেয়েছে প্রশাসন।
ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি ও জালিয়াতি রোধে বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। অভিযান শেষে ১২ অক্টোবর থেকে টিকিটের নাম ও যাত্রীর এনআইডির নাম মিলিয়ে দেখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
জেলা প্রশাসক বলেন, আগামী ১২ অক্টোবর থেকে টিকিটের নামের সঙ্গে যাত্রীর এনআইডির নামের মিল না থাকলে তাকে ট্রেনে ভ্রমণ করতে দেওয়া হবে না। সিলেট থেকে ঢাকা কিংবা অন্য কোনো গন্তব্যে যেতে হলে টিকিটের সঙ্গে পরিচয়পত্রের তথ্য মিলতে হবে।

তিনি আরও জানান, অভিযানে কয়েকজন যাত্রীর টিকিটের নামের সঙ্গে এনআইডির নামের অসংগতি পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে যাত্রীদের তিন থেকে চার দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। এরপর থেকে রেলস্টেশনে নিয়মিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তদারকি ও অভিযান চলবে।

জেলা প্রশাসনের ভাষ্য, সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো এবং টিকিট কালোবাজারিমুক্ত করতে এ নজরদারি অব্যাহত থাকবে। এর আগে গত বছরের অক্টোবরেও নিজ নামে টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কিছুদিন পর নজরদারি শিথিল হয়ে পড়লে আবারও টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ সামনে আসে।
সিলেট রেলস্টেশনে টিকিট সংকট ও কালোবাজারির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট সড়কের নাজুক অবস্থার কারণে রেলপথে যাত্রীদের চাপ বাড়ায় টিকিটের চাহিদাও বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর মাত্র তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যেই অধিকাংশ টিকিট শেষ হয়ে যায়। পরে এসব টিকিট বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমান ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি ও মজুদদারির অভিযোগে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত বুধবার মামলার নথিপত্র তদন্ত সংস্থাটির কাছে পৌঁছেছে। মামলাটি তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক আবদুল আহাদ।
মামলার নথি অনুযায়ী, সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী বিভিন্ন আন্তনগর ট্রেনের টিকিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। নির্ধারিত সময়ে অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা টিকিট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়তি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি যাচাই করতে ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করেন আদালত। সেখানে টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সন্দেহের সৃষ্টি করে। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, টিকিট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারও কারও সহযোগিতায় একটি চক্র দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করে থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
টিকিট সংকট ও কালোবাজারির এ পরিস্থিতি সিলেটের পর্যটনশিল্পের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পেয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হতে পারেন অনেক যাত্রী।
সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসে যাতায়াত করেন বিপুলসংখ্যক যাত্রী। এসব ট্রেনের টিকিটের চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রি শুরুর পরপরই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম বলেন, রেলের টিকিট মূলত অনলাইনে বিক্রি হয়, তবে কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও টিকিট কেনেন। টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়ায় স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই বলে জানান তিনি।
এখন ১২ অক্টোবর থেকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার অপেক্ষা। এতে টিকিট কালোবাজারি কমার পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীরা স্বস্তিতে টিকিট পাবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


