
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় পর্যটন খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আবাসনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পরও থেমে নেই কক্সবাজারের পর্যটন কার্যক্রম। সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসছেন পর্যটকেরা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউবা পরিবার নিয়ে উপভোগ করছেন সমুদ্রের নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের ছন্দ। তবে থাকার জায়গা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে সতর্ক অনেকেই। রিসোর্টের পরিবর্তে তাঁদের অনেকে শহরের হোটেলগুলোতে থাকার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ঘিরে পর্যটকদের আনাগোনা অব্যাহত রয়েছে। সৈকতে হাঁটাহাঁটি, সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘোড়ায় চড়া কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে ছবি তোলার মধ্য দিয়ে অবসর উপভোগ করছেন ভ্রমণকারীরা। দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার বাইরে কিছুটা স্বস্তির সময় কাটাতে আসা পর্যটকদের কাছে কক্সবাজার এখনো অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে ইনানীর রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তাঁদের ভ্রমণের পরিকল্পনায় নিরাপত্তার বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারের আকর্ষণ মূলত সমুদ্রসৈকত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নানা পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে। কিন্তু ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি রাতে কোথায় থাকবেন, সেই সিদ্ধান্তও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিবার ও শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে আসা ব্যক্তিরা আবাসনের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন। কোথায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার পথ কেমন এবং হোটেলের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয় তাদের বিবেচনায় আসছে।

এমন পরিস্থিতিতে শহরের হোটেলগুলোকে আবাসনের বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন অনেক পর্যটক। শহরের ভেতরে অবস্থিত হোটেলগুলো থেকে খাবারের দোকান, বাজার, যানবাহন এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা পাওয়া তুলনামূলক সহজ। পাশাপাশি পরিচিত ও জনবহুল এলাকায় থাকার বিষয়টিও অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক। ফলে সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক ভ্রমণ পরিকল্পনা ঠিক রাখলেও আবাসনের ক্ষেত্রে শহরের হোটেলকে প্রাধান্য দিচ্ছেন কেউ কেউ।


তবে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে ঠিক কতটা প্রভাব পড়েছে, তা নির্ধারণে হোটেল বুকিং, পর্যটকের সংখ্যা ও বাতিল হওয়া ভ্রমণ পরিকল্পনার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একটি দুর্ঘটনার কারণে পুরো কক্সবাজারের পর্যটন পরিস্থিতি বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং পর্যটকদের উপস্থিতি, আবাসন বেছে নেওয়ার প্রবণতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেই পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। পর্যটকেরা যখন ছুটি কাটাতে কোনো হোটেল বা রিসোর্টে যান, তখন তাঁরা সাধারণত কক্ষের সুযোগ-সুবিধা, ভাড়া, পরিবেশ ও অবস্থানকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু আগুনের মতো দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, এসবের পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, কার্যকর অ্যালার্ম, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে হোটেল ও রিসোর্টে অতিথিদের চাপ বাড়লে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু কাগজে-কলমে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেই চলবে না; সেগুলো বাস্তবে কার্যকর কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থাও থাকা জরুরি।
কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটকবাহী যানবাহন, সৈকতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষের জীবিকা। পর্যটকদের আস্থা কমে গেলে এর প্রভাব শুধু আবাসন ব্যবসায় নয়, পুরো পর্যটন অর্থনীতিতে পড়তে পারে। আবার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকেরা নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে পারবেন, যা স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এ অবস্থায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। হোটেল ও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নিজেদের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা এবং কোনো ঘাটতি থাকলে দ্রুত তা দূর করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরাপত্তাবিধি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পর্যটকদেরও বুকিংয়ের আগে আবাসন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, ইনানীর রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরও কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা অব্যাহত রয়েছে। তবে ভ্রমণের আনন্দের সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। অনেকের কাছে এখন শুধু সমুদ্র দেখা কিংবা ভালো পরিবেশে সময় কাটানোই যথেষ্ট নয়; নিরাপদ আবাসনও তাঁদের ভ্রমণের অন্যতম শর্ত। পর্যটকদের এই আস্থা ধরে রাখতে হলে কক্সবাজারের প্রতিটি হোটেল ও রিসোর্টে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, পর্যটনের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন ভ্রমণ শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা থাকে।


