
দীর্ঘ প্রায় এক দশকের অপেক্ষার পর যাত্রী পরিবহনের অনুমোদন পেয়েছে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের সবচেয়ে বড় মডেল ম্যাক্স ১০। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) এই অনুমোদনের ফলে উড়োজাহাজটির বাণিজ্যিক সরবরাহের পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধা দূর হয়েছে। তবে বিভিন্ন বিমান সংস্থার কাছে এর সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০২৭ সালে।
ওয়াশিংটনের এভারেট শহরে বোয়িংয়ের উৎপাদনকেন্দ্র পরিদর্শনকালে অনুমোদনের বিষয়টি জানান যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি। তিনি বলেন, কঠোর নিরাপত্তা পর্যালোচনা এবং হাজার হাজার ঘণ্টার পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর উড়োজাহাজটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাণশিল্পের জন্য একটি বড় অর্জন।
বোয়িংয়ের জন্য এই অনুমোদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দুর্ঘটনা, উৎপাদনগত ত্রুটি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাক্স ১০-এর অনুমোদন নতুন উড়োজাহাজ বাজারে আনা, ক্রেতাদের আস্থা ফেরানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টায় গতি আনতে পারে।

বোয়িং বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বিভাগের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফানি পোপ বলেন, এই অনুমোদনের মাধ্যমে এমন একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের পথ তৈরি হয়েছে, যা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল হিসেবে পাওয়া এই অনুমোদন প্রতিষ্ঠানটির পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


এক ফ্লাইটে বেশি যাত্রী, কমতে পারে আসনপ্রতি ব্যয়
বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাক্স ১০ উড়োজাহাজে সাধারণত ১৮৫ থেকে ২১০ জন যাত্রী বহন করা যাবে। অন্যদিকে, একই সিরিজের ম্যাক্স ৯-এ ১৭৫ থেকে ১৯৫ জন এবং ম্যাক্স ৮-এ ১৬০ থেকে ১৮০ জন যাত্রী বসতে পারেন।
অধিক যাত্রী ধারণক্ষমতার কারণে জনপ্রিয় ও ব্যস্ত রুটগুলোতে বিমান সংস্থাগুলো একই ফ্লাইটে বেশি যাত্রী পরিবহনের সুযোগ পাবে। এতে আসনপ্রতি পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সীমিত ফ্লাইটে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এর প্রভাব সরাসরি টিকিটের দামে পড়বে কি না, তা নির্ভর করবে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন কৌশল, জ্বালানির দাম এবং সংশ্লিষ্ট রুটে প্রতিযোগিতার ওপর।

সরবরাহের অপেক্ষায় ১ হাজার ৫৫৫টি উড়োজাহাজ
২০১৭ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ প্রদর্শনীতে ম্যাক্স ১০ তৈরির ঘোষণা দেয় বোয়িং। ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতেই বড় ধারণক্ষমতার এই মডেল তৈরির উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন শর্তের কারণে উড়োজাহাজটির অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
বোয়িংয়ের কাছে এখনো বিশ্বের ৩০টির বেশি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের জন্য সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে ১ হাজার ৫৫৫টি ম্যাক্স ১০ উড়োজাহাজ। প্রতিষ্ঠানটির ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের মোট বকেয়া ক্রয়াদেশের ৩০ শতাংশেরও বেশি এই মডেলের।
ম্যাক্স ১০-এর উল্লেখযোগ্য গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস, ডেল্টা এয়ারলাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনস ও রায়ানএয়ার। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইনস ১০৫টি ম্যাক্স ১০ কেনার আদেশ দেয়। প্রয়োজনে আরও ৩৫টি কেনার সুযোগও রেখেছে সংস্থাটি।
বিপুলসংখ্যক ক্রয়াদেশ থাকায় অনুমোদনের পর উড়োজাহাজটির উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম বোয়িংয়ের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর নজরদারি
বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় ২০১৮ ও ২০১৯ সালে। ওই দুই বছরে ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়ায় ম্যাক্স ৮ মডেলের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মোট ৩৪৬ জন। দুর্ঘটনা দুটির পর উড়োজাহাজটির নকশা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
এরপর ২০২৪ সালে আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি ম্যাক্স ৯ উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় গায়ের একটি প্যানেল খুলে যাওয়ার ঘটনায় বোয়িংয়ের উৎপাদনমান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এসব ঘটনার পর বোয়িংয়ের ওপর নজরদারি বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। উৎপাদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আরোপের পাশাপাশি উড়োজাহাজ তৈরির মান নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে গত ১৮ মাসে কিছু বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে শিথিল করা হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদনের সীমা বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে ম্যাক্স ৭ মডেলও বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। একই বছরে ম্যাক্স ৭ ও ম্যাক্স ১০-এর অনুমোদন পাওয়াকে বোয়িংয়ের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
তবে ম্যাক্স ১০-এর অনুমোদন পেলেই যাত্রী পরিবহনের জন্য সব বাধা দূর হচ্ছে না। প্রতিটি উড়োজাহাজ অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের আগে প্রতিটি উড়োজাহাজকে পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও নিতে হবে।
এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কতটা এগোবে বোয়িং
ম্যাক্স ১০-এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের এ৩২১নিও। ২০১৭ সালে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করা এ মডেল পরিবারের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজটি যাত্রী ধারণক্ষমতা ও উড্ডয়ন-দূরত্বের ক্ষেত্রে ম্যাক্স ১০-এর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, বেশি যাত্রী পরিবহন এবং জ্বালানি খরচ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ম্যাক্স ১০ তৈরি করেছে বোয়িং। জ্বালানির মূল্য ও পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপে থাকা বিমান সংস্থাগুলোর কাছে উড়োজাহাজটির এই বৈশিষ্ট্য আকর্ষণীয় হতে পারে।
এদিকে, জুলাইয়ে এফএএ বোয়িংকে উৎপাদনকেন্দ্রেই ৭৩৭ ম্যাক্স ও ৭৮৭ মডেলের উড়োজাহাজের উড্ডয়নযোগ্যতার সনদ দেওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানায়। এর ফলে তৈরি করা উড়োজাহাজ উড্ডয়নের উপযোগী কি না, তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি আবারও কিছু দায়িত্ব ফিরে পেয়েছে।
সব মিলিয়ে ম্যাক্স ১০-এর অনুমোদন বোয়িংয়ের জন্য বড় অগ্রগতি। তবে উড়োজাহাজটির সফল বাণিজ্যিক যাত্রা নির্ভর করবে নিরাপত্তার মান বজায় রাখা, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ পৌঁছে দেওয়ার ওপর। দীর্ঘদিনের বিলম্ব কাটিয়ে বোয়িং এখন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।


