
সমুদ্রের নীল জলরাশি, সৈকতের সৌন্দর্য আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত কাটানোর আশায় কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই ভ্রমণই হয়ে উঠল জীবনের শেষ যাত্রা। ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারানো ১০ পর্যটকের মরদেহ অবশেষে ১০ দিন পর বুঝে পেলেন স্বজনরা। আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল যাদের, তাদের ফিরতে হলো নিথর দেহ নিয়ে।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ১০ পর্যটকের মরদেহ মঙ্গলবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে প্রশাসন। বেলা আড়াইটার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে পাঁচ পরিবারের সদস্যদের হাতে মরদেহ তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।

এদিকে, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ১০ দিন পর আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি চালিয়ে রিসোর্টের দ্বিতীয় তলার কার্নিশে লাশটি খুঁজে পান। মরদেহটি অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ থাকা পর্যটক নাসরিন আক্তারের বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার খিলগাঁও-মুগদা এলাকার একই পরিবারের ছয়জন। তাদের মরদেহ গ্রহণ করেন স্বজন আমিনুল ইসলাম খান। নিহতদের মধ্যে আছেন ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার নুর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবীর (৩৫), তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজান এবং ফারিয়ার ছোট ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী জেরিফ (২৪)।

এ ছাড়া নিহত হয়েছেন মো. সেলিমের তিন মেয়ে—ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (১৯)।

অন্যদিকে, যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা আক্তার (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোবাইনা (৯) ও সুনাইনার (৬) মরদেহ গ্রহণ করেছেন স্বজনরা।
মরদেহ পরিবহন ও দাফনের জন্য প্রতিটি পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
স্বজন আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ১০ দিন পর তাঁরা প্রিয়জনদের মরদেহ পেয়েছেন। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান তাঁরা। যাঁদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পাঁচ পরিবারের ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত কেউ ছাড় পাবে না। মামলা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়ায় দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছে তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ওই দিনই সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত প্রতিবছর লাখো পর্যটককে টানে। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে কেউ যেন আর এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার না হন—সেই প্রত্যাশাই এখন সবার। পর্যটনের আনন্দ নিরাপদ রাখতে রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।


