
Table of Contents
ভারতের রেলপথে সাত দিনের রাজকীয় ভ্রমণ, অথচ খরচ প্রায় ২৬ লাখ রুপি! সাধারণ ট্রেনযাত্রার সঙ্গে এর পার্থক্য শুধু ভাড়ায় নয়, বরং থাকার ব্যবস্থা, খাবার, ব্যক্তিগত সেবা ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার আয়োজনেও। ভারতের বিলাসবহুল পর্যটন ট্রেন ‘মহারাজাস এক্সপ্রেসে’ মুম্বাই থেকে দিল্লি পর্যন্ত ভ্রমণ করে আলোচনায় এসেছেন মার্কিন ইউটিউবার দম্পতি কারা ও নেট। তাঁদের সাত দিনের এই ভ্রমণে খরচ হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার মার্কিন ডলার। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ট্রেনটির বিলাসবহুল আয়োজন। তাঁদের মূল্যায়ন, ব্যয়বহুল হলেও এই যাত্রা ছিল অর্থের যথাযথ মূল্য পাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা।

ট্রেনের ভেতরেই পাঁচ তারকা হোটেলের বিলাসিতা

কারা ও নেটের ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ট্রেনের ‘হীরা’ বা ‘হিরা’ (Heera) স্যুইট। সাধারণ ট্রেনের কামরার ধারণাকে ছাড়িয়ে এই স্যুইটে রয়েছে প্রশস্ত থাকার জায়গা, জানালার পাশে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত ওয়াই-ফাই, মিনি বার এবং বাথটাবসহ বিলাসবহুল বাথরুম।

দম্পতি জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলেও ট্রেনের ভেতরে এমন বাথটাব দেখে তাঁরা বিস্মিত হয়েছেন। পুরো আয়োজন তাঁদের কাছে ট্রেনের কামরার চেয়ে চলন্ত বিলাসবহুল হোটেলের অভিজ্ঞতাই বেশি মনে হয়েছে।
মহারাজাস এক্সপ্রেসে বিভিন্ন শ্রেণির কেবিন রয়েছে। এর মধ্যে স্যুইট ও প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইটে আরও বেশি জায়গা ও ব্যক্তিগত সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইটে রয়েছে আলাদা শোবার ঘর, বসার জায়গা এবং ব্যক্তিগত বাটলারের সুবিধা।

সাত দিনে ৫০০-এর বেশি খাবারের স্বাদ
এই যাত্রায় শুধু বিলাসবহুল কক্ষ নয়, খাবারের আয়োজনও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। কারা ও নেটকে দেওয়া একটি রান্নার বইয়ে সাত দিনের ভ্রমণে ৫০০টির বেশি স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
ভ্রমণকালে তাঁদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে ট্রেনের শেফের তৈরি সবজির শোরবা বা ব্রথ। এর স্বাদের রহস্য জানতে চাইলে শেফ জানান, সবজি ঠিক ৪৫ মিনিট ধরে জ্বাল দেওয়া, গোলমরিচের ঝাঁজ এবং খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া ভালোবাসাই এর বিশেষত্ব।
ট্রেনের খাবারের তালিকায় ভারতীয় আঞ্চলিক পদসহ নানা ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। ভ্রমণ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত খাবার ও পানীয়ের পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য রয়েছে পরিচর্যা ও পরিবেশনের বিশেষ ব্যবস্থা। অর্থাৎ, এখানে খাবার কেবল ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়; বরং ভ্রমণের অভিজ্ঞতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উদয়পুরে ফুলেল অভ্যর্থনা, সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি ও গাইড
সাত দিনের এই সফরে ট্রেনের ভেতরের বিলাসিতার পাশাপাশি ভারতের ঐতিহাসিক শহর ও সংস্কৃতি উপভোগের সুযোগও পেয়েছেন এই দম্পতি।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদয়পুরে পৌঁছালে তাঁদের ফুলের পাপড়ি দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। স্যুইটের যাত্রী হিসেবে তাঁরা পেয়েছেন ব্যক্তিগত গাড়ি ও গাইডের সুবিধা। শহরটিতে তাঁরা পিচোলা হ্রদে নৌভ্রমণ করেন, ঘুরে দেখেন স্থানীয় বাজার এবং কেনেন রঙিন কাচের চুড়ি।
এ ধরনের আয়োজন মহারাজাস এক্সপ্রেসের ভ্রমণ পরিকল্পনারই অংশ। ট্রেনটির বিভিন্ন প্যাকেজে নির্ধারিত গন্তব্যে দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা, পরিবহন, গাইড এবং ঐতিহাসিক স্থাপনায় প্রবেশের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে যাত্রীদের প্রতিটি গন্তব্যে আলাদাভাবে ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে হয় না।

২৬ লাখ রুপির টিকিটে আসলে কী কী পাওয়া যায়?
মহারাজাস এক্সপ্রেসের ব্যয়বহুল ভাড়ার অন্যতম কারণ হলো এর সর্বসমেত বা অল-ইনক্লুসিভ ভ্রমণব্যবস্থা। সাধারণত নির্ধারিত প্যাকেজ অনুযায়ী ট্রেনের কেবিনে থাকা, খাবার, নির্দিষ্ট পানীয়, দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, গাইড এবং বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা ভাড়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তবে সব ধরনের খরচ এই প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত নয়। প্যাকেজের শর্ত অনুযায়ী ব্যক্তিগত ভ্রমণবিমা, লন্ড্রি, ঐচ্ছিক ভ্রমণ, কিছু বিশেষ পানীয় এবং ট্রেনযাত্রার আগে বা পরে হোটেলে থাকার খরচ আলাদা হতে পারে। তাই টিকিটের দামকে শুধু ট্রেনে ওঠার ভাড়া হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না।
ট্রেনটির ভাড়া কেবিনের ধরন, যাত্রাপথ, মৌসুম ও প্যাকেজের ওপর নির্ভর করে। ২০২৬–২৭ মৌসুমের প্রকাশিত ভাড়ার তালিকায় সাত দিন-ছয় রাতের কয়েকটি ভ্রমণপথে ডিলাক্স কেবিনের ভাড়া জনপ্রতি ৮ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার থেকে শুরু হয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইটের ভাড়া জনপ্রতি ২৬ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত। এর সঙ্গে প্রযোজ্য কর যোগ হতে পারে। ফলে ২৬ লাখ রুপির অভিজ্ঞতাটি ট্রেনটির সব ধরনের কেবিন বা প্যাকেজের সাধারণ ভাড়া নয়; এটি দম্পতির নির্দিষ্ট ভ্রমণের ব্যয়।
একই খরচে ইউরোপের ট্রেনযাত্রার সঙ্গে তুলনা
কারা ও নেট তাঁদের আগের একটি ইউরোপীয় ট্রেনভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মহারাজাস এক্সপ্রেসের তুলনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে বুদাপেস্ট থেকে প্যারিস পর্যন্ত ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের একটি যাত্রায় প্রায় একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল, যদিও সেই অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় ২৪ ঘণ্টার।
অন্যদিকে মহারাজাস এক্সপ্রেসে প্রায় একই ব্যয়ে সাত দিন কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা। তাঁদের কাছে এই সময়ের ব্যবধান, খাবার, ব্যক্তিগত সেবা এবং বিভিন্ন পর্যটনস্থল ঘুরে দেখার আয়োজন ভ্রমণটিকে বিশেষ মূল্য দিয়েছে।
তবে দুই ট্রেনের রুট, প্যাকেজ ও সেবার ধরন এক নয়। তাই শুধু ভাড়া ও সময়ের তুলনা দিয়ে কোনটি বেশি সাশ্রয়ী, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। দম্পতির অভিজ্ঞতা মূলত দেখিয়েছে, বিলাসবহুল ট্রেনভ্রমণে যাত্রাপথের পাশাপাশি গন্তব্য, আতিথেয়তা ও সামগ্রিক অভিজ্ঞতাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু গন্তব্য নয়, ভ্রমণটাই যখন মূল আকর্ষণ
ভারতের রেলভ্রমণকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে মহারাজাস এক্সপ্রেস একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এখানে ট্রেন শুধু এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার মাধ্যম নয়; বরং থাকার জায়গা, খাবার, বিনোদন, ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সমন্বিত অভিজ্ঞতা।
যাঁদের কাছে ভ্রমণের অর্থ কেবল গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং যাত্রাপথের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা, তাঁদের জন্য এ ধরনের ট্রেনভ্রমণ বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে প্রায় ২৬ লাখ রুপির ব্যয় অধিকাংশ পর্যটকের জন্যই বড় অঙ্কের। ফলে মহারাজাস এক্সপ্রেস মূলত বিলাসবহুল পর্যটনের একটি বিশেষ আয়োজন, সাধারণ যাতায়াতের বিকল্প নয়।
কারা ও নেটের অভিজ্ঞতা সেই পার্থক্যই সামনে এনেছে—কখনো কখনো ভ্রমণের মূল্য শুধু কত দূর যাওয়া হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং পথে কী দেখলেন, কীভাবে সময় কাটালেন এবং কী ধরনের স্মৃতি নিয়ে ফিরলেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


