
Table of Contents
সমুদ্রের নীল জলরাশি, প্রবাল আর নারকেলগাছের সারি—সেন্টমার্টিন মানেই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১ নভেম্বর থেকে খুলছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের পর্যটন মৌসুম। পর্যটক বরণে প্রস্তুত দ্বীপের হোটেল-রিসোর্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্বপ্নের এই দ্বীপে যেতে জাহাজের টিকিট, থাকা-খাওয়া আর যাতায়াতের খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেরই কাটছে কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিন দিনের ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ দাঁড়াতে পারে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—সেন্টমার্টিন ভ্রমণ কি ক্রমেই সাধারণ পর্যটকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে?
বাড়ছে জাহাজ, কমছে না খরচের শঙ্কা

কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন নৌপথে চলতি মৌসুমে অন্তত ১০টি জাহাজ চলাচল করতে পারে। এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, বে-ক্রুজার ১, এমভি বারো আউলিয়া ও কেয়ারি সিন্দাবাদসহ বিভিন্ন জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। গত মৌসুমে এ পথে চলেছিল সাতটি জাহাজ। ফলে এবার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে জাহাজের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটকদের স্বস্তি মিলবে কি না, তা নির্ভর করছে টিকিটের প্রাপ্যতা, ভাড়া ও চলাচলের অনুমোদনের ওপর। কারণ, সেন্টমার্টিন ভ্রমণের প্রথম ধাপই হলো নৌযাত্রা। আর সেই যাত্রায় পছন্দের আসন নিশ্চিত করতে গিয়ে শুরুতেই বাজেটের বড় একটি অংশ খরচ হয়ে যেতে পারে।
জাহাজে সাধারণ সিট থেকে শুরু করে বিজনেস চেয়ার, মোজার্ট চেয়ার, বেড ও কেবিন—রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির আসন। সুবিধাভেদে যাওয়া-আসার টিকিটের দাম ৩ হাজার ৬০০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, সাশ্রয়ী আসন বেছে নিলেও একজন পর্যটককে শুধু যাতায়াতের জন্য কয়েক হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। আর পরিবার নিয়ে গেলে খরচের অঙ্কটা আরও বড়।

দুই রাতের থাকার খরচেই বাড়ছে বাজেট
জাহাজের টিকিট পাওয়া গেলেও ভ্রমণের হিসাব শেষ হচ্ছে না সেখানে। দ্বীপে পৌঁছে কোথায় থাকবেন, কত টাকা খরচ হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেন্টমার্টিনে ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সব আবাসনের ভাড়া এক নয়।
প্রিমিয়াম হোটেল ও রিসোর্টে এক রাতের ভাড়া ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা। স্ট্যান্ডার্ড হোটেল ও রিসোর্টে তা ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর ইকোনমি হোটেল ও রিসোর্টে এক রাতের জন্য খরচ হতে পারে ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। ছুটির দিন কিংবা পর্যটকের চাপ বাড়লে ভাড়া আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফলে দুই রাতের আবাসনেই একজন পর্যটকের খরচ দাঁড়াতে পারে ৪ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত—যদিও কক্ষের ধরন ও কতজন একসঙ্গে থাকছেন, তার ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে খাবার, স্থানীয়ভাবে যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ।

তিন দিনের ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ সর্বনিম্ন ১৫ হাজার টাকা!
একটু হিসাব করলেই বোঝা যায়, সেন্টমার্টিনে তিন দিনের ভ্রমণ অনেকের জন্য কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে। যাওয়া-আসার টিকিট, দুই রাতের সাশ্রয়ী আবাসন, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মিলিয়েও জনপ্রতি প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হতে পারে। আর একটু ভালো মানের হোটেল কিংবা তুলনামূলক আরামদায়ক আসন বেছে নিলে খরচ বাড়বে আরও।
এই ব্যয় সবার পক্ষে বহন করা সহজ নয়। সীমিত আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সারা বছর পরিকল্পনা করেও হয়তো এমন একটি ভ্রমণের বাজেট জোগাড় করতে পারেন না। একসঙ্গে কয়েকজনের পরিবার নিয়ে গেলে মোট ব্যয় কয়েক দশ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সমুদ্র দেখা, সূর্যাস্ত উপভোগ কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর ইচ্ছা থাকলেও তাই অনেকের কাছে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ হয়ে উঠছে হিসাব-নিকাশের বিষয়। প্রশ্নটা শুধু ভ্রমণের খরচ নিয়ে নয়; বরং দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ কতটা সাধারণ মানুষের নাগালে থাকছে, তা নিয়েও।
পর্যটন কি শুধু সামর্থ্যবানদের জন্য?
ভ্রমণ মানেই বিলাসিতা নয়। কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি কাটানো, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগও ভ্রমণ। কিন্তু যাতায়াত ও আবাসনের খরচ যদি অনেক বেশি হয়, তাহলে সেই সুযোগ সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকে না।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের কাছে তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সেন্টমার্টিনে কি শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম পর্যটকদের জন্যই ব্যবস্থা থাকবে, নাকি সীমিত বাজেটের ভ্রমণকারীদের কথাও ভাবা হবে?
এ ক্ষেত্রে জাহাজে সাশ্রয়ী আসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, টিকিটের শ্রেণিভিত্তিক ভাড়া ও সুবিধার স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং আবাসনের ভাড়া আগেই জানার সুযোগ পর্যটকদের পরিকল্পনা সহজ করতে পারে। পাশাপাশি বাজেট অনুযায়ী হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের তথ্য সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ভ্রমণকারীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তবে সাশ্রয়ী ভ্রমণের সুযোগ তৈরির অর্থ পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা নয়। বরং নির্ধারিত পর্যটকসংখ্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম মেনেই পর্যটনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রকৃতি বাঁচুক, সচল থাকুক স্থানীয় অর্থনীতি
সেন্টমার্টিনের পর্যটন শুধু পর্যটকদের বিনোদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বীপের মানুষের জীবিকা। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌযান ও অন্যান্য পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের আয় নির্ভর করে পর্যটকের উপস্থিতির ওপর। মৌসুম শুরু হলে তাঁদের ব্যবসায় গতি ফেরার প্রত্যাশা তৈরি হয়।
কিন্তু পর্যটনকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা করাও জরুরি। প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে সেন্টমার্টিনের মূল আকর্ষণই হুমকির মুখে পড়বে। তাই পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
একই সঙ্গে পর্যটকের ব্যয় যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সে জন্য ভাড়া ও সেবার মূল্য সম্পর্কে স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটকেরা আগে থেকেই সম্ভাব্য খরচ জানতে পারলে পরিকল্পনা করে ভ্রমণে যেতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে পর্যটনসেবার প্রতি আস্থাও বাড়বে।
সবার নাগালে আসুক প্রবালদ্বীপ
সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য নয়। নীল সমুদ্র, প্রবাল আর নারকেলগাছের সারি দেখতে চান সব বয়সী, সব পেশার মানুষ। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে যদি যাতায়াত ও আবাসনের খরচই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে পর্যটনের সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে না।
১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে দ্বীপের দুয়ার। এখন প্রত্যাশা, জাহাজ চলাচল ও আবাসনের ব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালিত হবে, যাতে পরিবেশ সংরক্ষণের শর্ত বজায় রেখেই বিভিন্ন সামর্থ্যের মানুষ ভ্রমণের সুযোগ পান।
কারণ, সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাওয়ার স্বপ্নটা সবার হতে পারে। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, স্বচ্ছ ভাড়া এবং সাশ্রয়ী আবাসনের বাস্তবসম্মত সুযোগ। পর্যটক বরণের প্রস্তুতি তাই শুধু দ্বীপের দুয়ার খোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; ভ্রমণকে মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে আনার উদ্যোগও হতে হবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।


