
মধ্য-পূর্ব এশিয়ার দেশ মঙ্গোলিয়া মানেই কি শুধু বিশাল তৃণভূমি, মরুভূমি আর ঘোড়সওয়ার যাযাবর? নাহ। দেশটির একেবারে উত্তরে, রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষা গভীর তাইগা অরণ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক পৃথিবী, যেখানে পৌঁছাতেই লাগে কয়েক দিন। আর শেষ পথটুকু পাড়ি দিতে হয় ঘোড়ায়।
এখানেই বসবাস সাাতানদের—মঙ্গোলিয়ার ছোট্ট এক রেইনডিয়ার-পালক সম্প্রদায়। প্রায় ৮০টি পরিবার নিয়ে তাদের জীবন। শহরের কোলাহল থেকে এত দূরে যে এখানে বিদ্যুৎ নেই, কলের পানি নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও যেন অন্য এক পৃথিবীর গল্প। কিন্তু আছে ঘন বন, পাহাড়ি ঝরনা, অসংখ্য রেইনডিয়ার আর রাতের আকাশজুড়ে ঝলমলে মিল্কিওয়ে।
যখন ঘোড়ায় চড়ে শিবিরের কাছে পৌঁছাবেন, প্রথম যে দৃশ্যটি চোখে পড়বে, তা হয়তো সারাজীবন মনে থাকবে। জঙ্গল থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে শত শত রেইনডিয়ার। দূরে গাছের সারির পাশে ধোঁয়া উঠছে শঙ্কু আকৃতির ঐতিহ্যবাহী তাঁবু—যাকে তারা বলে ‘অর্তজ’।
এই তাঁবুই এখানে আপনার হোটেল।কাঠের খাট, মাঝখানে ছোট চুলা, আর ব্যাগে যতটুকু নেওয়া যায় ততটুকুই জীবন। শীতকালে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তাই ঋতু বদলালে পুরো শিবিরও বদলে যায়। রেইনডিয়ারের পিঠে চড়ে চলে তাঁবু, খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী—সবকিছু।

তবে এই কঠিন জীবনের মধ্যেও খাবারে আছে নিজস্ব ঐতিহ্য। রেইনডিয়ারের দুধ দিয়ে তৈরি হয় পনির, দই, ক্রিম, মাখন আর নোনতা দুধ-চা। রেইনডিয়ার সাধারণত মাংসের জন্য জবাই করা হয় না। অতিথিদের খাবারে তাই ভেড়ার মাংসই বেশি দেখা যায়। আর ফ্রিজ না থাকায় জবাইয়ের পর দ্রুত খেয়ে ফেলা হয় কলিজা, কিডনি, নাড়িভুঁড়ির মতো অংশগুলো।
সাাতানদের কাছে রেইনডিয়ার শুধু পশু নয়—তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও টিকে থাকার অবলম্বন। তারা ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে শিবির বদলায়, প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বাঁচে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধরে রেখেছে নিজেদের পোশাক, আচার ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস।
অবশ্য এই জীবন এখন বদলাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও শিকারের ওপর বিধিনিষেধের কারণে নগদ আয়ের প্রয়োজন বেড়েছে। পর্যটন তাই তাদের কাছে শুধু ব্যবসা নয়—নিজেদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখারও একটি পথ।
তাই মঙ্গোলিয়ায় গেলে শুধু বিখ্যাত মরুভূমি কিংবা তৃণভূমি দেখেই ফিরবেন না। সুযোগ থাকলে চলে যান উত্তরের এই তাইগায়।

রাস্তা যেখানে শেষ, সেখান থেকেই হয়তো শুরু হবে আপনার মঙ্গোলিয়ার সবচেয়ে অসাধারণ ভ্রমণ।
ঢাকা থেকে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটার সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। তবে কানেক্টিং ফ্লাইটে সাধারণত ১১ থেকে ১৩ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আর সড়ক পথে প্রায় ২ দিন। বাংলাদেশে মঙ্গোলিয়ার কোন দূতাবাস না থাকায় ভিসা আবেদনের জন্য আপনাকে দিল্লি যেতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ক্যটাগরির ভিসার জন্য অবশ্য ঘরে বসে ই-ভিসার আবেদন করলেই হয়ে যায়। ৫০ মার্কিন ডলার ফি দিয়ে ৩ থেকে ৫ কর্মদিবসেই হাতে পেয়ে যাবেন আপনার ই-ভিসা। তবে মঙ্গোলিয়া ভ্রমণ করে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে আপনি এতটাই বিমোহিত হবেন, যে ভ্রমণের সব জটিলতা আর ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে- এ কথা হলফ করে বলাই যায়।

