
কলম্বাস কিংবা স্বাধীনতার আগের আমল থেকে কলকাতার কলেজ স্ট্রিট মানেই বুদ্ধিজীবী আর বইপ্রেমীদের আড্ডা। আর এই আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো দেড়শ বছরের প্রাচীন মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। উনিশ শতকের শেষের দিকে বা ১৮৫০-এর দশকের আশেপাশের সময়ে সূর্য সেন স্ট্রিট ও কলেজ স্ট্রিটের সংযোগস্থলে এই ঐতিহ্যবাহী দোকানটি গড়ে ওঠে।প্রতিষ্ঠাতা পুঁটিরামের নামানুসারে দোকানটির নামকরণ হয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার খাবার ও মিষ্টি বাংলার সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার সাথে জড়িয়ে পড়েছে।

লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস-এর মতো বহু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রামী একসময় এই দোকানে যাতায়াত করেছেন।পুরনো কলকাতার নস্ট্যালজিয়া আর কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গন্ধমাখা বাতাসে পুঁটিরামের স্বাদ নেওয়া মানে যেন এক টুকরো ইতিহাসকে স্পর্শ করা। আপনি যখন কাঠের পুরোনো বেঞ্চে বসে হিংয়ের কচুরি থেকে শুরু করে গুড়ের রসগোল্লার স্বাদ নিয়েছেন, তখন তা কেবল খাওয়া ছিল না—ছিল এক পরম তৃপ্তির অভিজ্ঞতা।


সেখানে বসে প্রথম যখন প্লেটে এল গরম গরম হিংয়ের কচুরি আর আলুর দম, তখনই জিভে জল চলে আসে। কচুরিতে প্রথম কামড় দিতেই হিংয়ের সেই চেনা তীব্র অথচ সুমিষ্ট গন্ধটা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। ওপরটা মুচমুচে, আর ভেতরটা ডালের পুরে ঠাসা। তার সাথে মাখা মাখা, সামান্য ঝাল-মিষ্টি আলুর দম যেন এক স্বর্গীয় যুগলবন্দী! মশলার সেই ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতোই।
নোনতার পর্ব শেষ হতেই টেবিল আলো করে এল ওখানকার বিখ্যাত রাজভোগ। চামচ দিয়ে আলতো চাপ দিতেই স্পঞ্জের মতো নরম মিষ্টি থেকে টপটপ করে রসিয়ে পড়া সেই দৃশ্য যেকোনো মিষ্টিপ্রেমীর হৃদয় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আর সবশেষে পাতে পড়ল নলেন গুড়ের রসগোল্লা। গুড়ের সেই খাঁটি, সোঁদা মাটির মতো গন্ধ আর হালকা খয়েরি রঙের রসগোল্লাটি মুখে দিতেই মনে হলো, কলকাতার বনেদিয়ানা যেন এই একটি মিষ্টির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
ভরপেট জলখাবার শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে পা বাড়ালাম কলেজ স্কোয়ারের পুজো মন্ডপের দিকে…


