
কক্সবাজারের আবাসিক হোটেলগুলোতে অতিথির পরিচয় ও বয়স যাচাই ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের কক্ষ ভাড়া দিলে সংশ্লিষ্ট হোটেল মালিক ও ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ও কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত নিরাপদ পর্যটনবিষয়ক মতবিনিময় সভায় তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। কক্সবাজার ইনস্টিটিউট ও পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ সুভাষ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সভায় হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁর মালিক, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।
সভায় শামীম আরা স্বপ্না বলেন, কক্সবাজারের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের কথিত প্রেমিকদের সঙ্গে অবস্থান করতে দেওয়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক। যাদের একা হোটেলে থাকার উপযুক্ত বয়স হয়নি, তাদের পরিচয় ও বয়স যাচাই না করে কক্ষ ভাড়া দেওয়া দায়িত্বহীনতার পরিচয়। এ ধরনের অনিয়মের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে। তাই হোটেল কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

তিনি বলেন, কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এ অঞ্চলের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে হোটেল ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিচয় ও বয়স যাচাইয়ে কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে হোটেল মালিক বা ব্যবস্থাপকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সভায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গে উঠে আসে কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। গত ৮ অক্টোবর ১৩ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের আগে সে কক্সবাজারের একটি হোটেলে তার কথিত প্রেমিক রাজুর সঙ্গে অবস্থান করেছিল। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় তার বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রকৃত বয়সের সঙ্গে নথিভুক্ত বয়সের এই অসংগতি হোটেলগুলোতে অতিথির পরিচয় ও বয়স যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম সাজেদুর রহমান বলেন, কুমিল্লার ওই ঘটনার পর কক্সবাজারের নামও আলোচনায় এসেছে, যা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জেলার ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগজনক। পর্যটনশিল্পের স্বার্থে নেতিবাচক প্রচারণা ও অপতৎপরতা মোকাবিলা করার পাশাপাশি কক্সবাজারের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেন পুরো পর্যটন এলাকার সুনাম ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হোটেল-মোটেলগুলোতে নিয়ম মেনে সেবা পরিচালনা করা জরুরি।
মতবিনিময় সভায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়ও উঠে আসে। গত ১৭ অক্টোবর মেরিন ড্রাইভের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এর কয়েক দিন পর, ২১ অক্টোবর হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে প্রাণ হারান আরও পাঁচ পর্যটক। পরপর এসব ঘটনায় হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা, সমুদ্রসৈকতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রশাসন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। হোটেলে অতিথির পরিচয় যাচাই, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং সমুদ্রসৈকতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি এবং পর্যটন ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন। আলোচনায় পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সুনাম ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।


