
অচেনা একটি শহর। চারপাশে নতুন মানুষ, নতুন স্থাপনা, নতুন সংস্কৃতি। হঠাৎ সেই ভিড়ের মাঝেই আপনিও যেন হয়ে গেলেন সেই শহরেরই একজন!
ভ্রমণের স্মৃতি এখন শুধু ক্যামেরার ফ্রেমে আটকে থাকে না। পর্যটকের সাজেও ধরা পড়ে একটি দেশের সংস্কৃতি। তাই বিদেশে গিয়ে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। কেউ কিয়োটোর রাস্তায় কিমোনো পরে হাঁটছেন, কেউ সিউলের রাজপ্রাসাদের সামনে হানবক পরে ছবি তুলছেন। আবার কেউ ভিয়েতনামের পুরোনো শহরে পরে নিচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী আও দাই।
কারও কাছে এটি নিছক ফ্যাশন, কারও কাছে সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করার যুগে এসব পোশাক হয়ে উঠেছে ভ্রমণের স্মৃতিরও একটি অংশ।



জাপান: কিমোনো
জাপানের কিয়োটোর পুরোনো রাস্তা, মন্দির আর ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে কিমোনো পরা পর্যটকের দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত। বিশেষ করে নারী পর্যটকদের মধ্যে এর আকর্ষণ বেশি হলেও পুরুষদের জন্যও কিমোনো ও হাকামার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিমোনোর নকশা, ফুলের মোটিফ, প্রশস্ত কোমরবন্ধ এবং ঐতিহ্যবাহী জাপানি সাজ পর্যটকদের কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও জাপানের সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে পড়ার অনুভূতি দেয়। কিয়োটোর গিওন, হিগাশিয়ামা ও আরাশিয়ামার মতো এলাকায় কিমোনো ভাড়ার দোকান পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ কিমোনো ভাড়া প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ইয়েন থেকে শুরু হতে পারে। চুলের সাজ, উন্নতমানের পোশাক বা বিশেষ ফটোশুট যুক্ত হলে খরচ আরও বাড়ে। পুরুষদের কিমোনোর ভাড়াও আলাদা প্যাকেজে পাওয়া যায়।
অর্থাৎ কয়েক হাজার ইয়েনেই একজন পর্যটক শুধু পোশাক নয়, সঙ্গে নিয়ে নিতে পারেন জাপানি সংস্কৃতির একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

দক্ষিণ কোরিয়া: হানবক
সিউলের রাজপ্রাসাদের সামনে রঙিন হানবক পরে হাঁটছেন পর্যটক—দৃশ্যটি যেন কোরিয়ান কোনো ঐতিহাসিক নাটকের দৃশ্য!
দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানীয় পোশাকের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে হানবক সবচেয়ে জনপ্রিয় বিকল্পগুলোর একটি। নারী ও পুরুষ—দুজনের জন্যই আলাদা নকশার হানবক পাওয়া যায়। শিশুদের জন্যও রয়েছে বিশেষ পোশাক।
হানবকের উজ্জ্বল রং, প্রশস্ত আকৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী নকশা পর্যটকদের আকর্ষণ করে মূলত ছবির জন্য। বিশেষ করে গিয়ংবকগুং প্রাসাদ ও বুখন হানোক ভিলেজের পরিবেশে এই পোশাকের সঙ্গে ভ্রমণের ছবি হয়ে ওঠে আরও আলাদা।
গিয়ংবকগুং স্টেশন ও বুখন এলাকার আশপাশে অসংখ্য হানবক ভাড়া দেওয়ার দোকান রয়েছে। সাধারণত ২ থেকে ৪ ঘণ্টার ভাড়া প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোরিয়ান ওন, আর থিম বা প্রিমিয়াম পোশাকে খরচ প্রায় ২৫ থেকে ৪০ হাজার ওন পর্যন্ত হতে পারে।
আর রয়েছে বাড়তি আকর্ষণ—হানবক পরে সিউলের কয়েকটি রাজপ্রাসাদে প্রবেশের ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য মওকুফের সুবিধাও রয়েছে।
তাই কোরিয়া ভ্রমণে হানবক অনেকের কাছেই একই সঙ্গে ফ্যাশন, ছবি আর সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা।

ভিয়েতনাম: আও দাই
দীর্ঘ, শরীরের সঙ্গে মানানসই টিউনিক আর তার নিচে প্যান্ট—ভিয়েতনামের ঐতিহ্যবাহী আও দাই দেখতে যেমন মার্জিত, তেমনি দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
নারীদের আও দাই পর্যটকদের মধ্যে বেশি পরিচিত হলেও পুরুষদের জন্যও আলাদা ধরনের আও দাই রয়েছে। হোই আন শহর বিশেষভাবে পরিচিত এর জন্য। পুরোনো শহরের রঙিন ভবন আর সরু রাস্তার মাঝে আও দাই পরে ছবি তোলা অনেক পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের ভাড়া-তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ আও দাই ভাড়া করতে প্রায় ১ লাখ থেকে ৩ লাখ ভিয়েতনামি ডং লাগতে পারে। কিনতে চাইলে সাধারণ তৈরি পোশাক প্রায় ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ ডং, আর হোই আনে কাস্টম তৈরি পোশাকের দাম প্রায় ১৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ ডং পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যারা ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে পোশাকটি সঙ্গে নিয়ে ফিরতে চান, তাদের কাছে কাস্টম তৈরি আও দাই আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।

মরক্কো: জেলাবা
মরক্কোর পুরোনো শহর, ব্যস্ত বাজার কিংবা মরুভূমির পটভূমিতে লম্বা, ঢিলেঢালা জেলাবা পরে দাঁড়ালে ছবিটাই যেন বদলে যায়।
মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী এই পোশাকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর লম্বা আকৃতি ও মাথার হুড। স্থানীয় আবহাওয়া ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পোশাকটির সম্পর্ক থাকায় পর্যটকদের কাছে এটি শুধু সাজ নয়, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম।
পুরুষ ও নারী—দুজনের জন্যই জেলাবার বিভিন্ন ধরন পাওয়া যায়। মারাকেশের মদিনা, ঐতিহ্যবাহী বাজার ও স্থানীয় পোশাকের দোকানগুলোতে এগুলো পাওয়া যায়। সাধারণ কাপড়ের জেলাবা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও হাতে কাজ, উন্নত কাপড় বা বিশেষ নকশার পোশাকের দাম অনেক বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে মরুভূমিতে ভ্রমণ করা পর্যটকদের কাছে জেলাবা আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে—কারণ পোশাক, পরিবেশ আর স্থাপত্য মিলে ছবিতে তৈরি হয় একেবারে অন্যরকম আবহ।

ভারত: শাড়ি ও কুর্তা
ভারতে স্থানীয় পোশাক পরার অভিজ্ঞতা যেন সংস্কৃতির বিশাল এক দরজা খুলে দেয়।
বিদেশি নারী পর্যটকদের মধ্যে শাড়ি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করে। উজ্জ্বল রং, বিভিন্ন ধরনের কাপড়, নকশা আর পরার বৈচিত্র্য শাড়িকে করে তুলেছে ভারত ভ্রমণের জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
পুরুষ পর্যটকদের মধ্যে আবার কুর্তা-পাজামা কিংবা ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়।
কলকাতা, দিল্লি, জয়পুর, মুম্বাইসহ বড় শহরের বাজার ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের দোকানে এসব পোশাক পাওয়া যায়। পর্যটন এলাকাগুলোতে কিছু জায়গায় ফটোশুটের জন্য পোশাক ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে দাম নির্দিষ্ট নয়—সাধারণ কটন শাড়ি থেকে শুরু করে হাতে বোনা বা সিল্কের শাড়ি পর্যন্ত দামের বিশাল পার্থক্য রয়েছে।

থাইল্যান্ড: ঐতিহ্যবাহী থাই পোশাক
থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পোশাকও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করছে। বিশেষ করে মন্দির, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক ফটোশুটের সময় স্থানীয় পোশাক বেছে নেন অনেক পর্যটক।
নারীদের পোশাকে থাকে মার্জিত নকশা ও উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার। পুরুষদের জন্যও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বিভিন্ন ধরন।
ব্যাংককের ঐতিহাসিক এলাকা ও পর্যটনকেন্দ্রিক জায়গাগুলোতে এমন পোশাক ভাড়া বা কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ফটোশুটের জন্য নেওয়া পোশাকের খরচ পোশাকের মান, সময় ও ফটোগ্রাফি প্যাকেজের ওপর নির্ভর করে।
স্থানীয় স্থাপনার সামনে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ছবি—থাইল্যান্ড ভ্রমণের স্মৃতিতে তাই যোগ হতে পারে একেবারেই অন্যরকম একটি অধ্যায়।
পোশাক কেন এত আকর্ষণীয়?
আসলে পর্যটকের কাছে স্থানীয় পোশাক পরা মানে শুধু সাজ বদলানো নয়। এটি একটি জায়গাকে দেখা থেকে অনুভব করার চেষ্টা।
একজন পর্যটক যখন কিমোনো পরে কিয়োটোর সরু রাস্তায় হাঁটেন, হানবক পরে কোরিয়ার রাজপ্রাসাদের সামনে দাঁড়ান কিংবা আও দাই পরে হোই আন ঘুরে দেখেন—তখন তিনি কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও সেই সংস্কৃতির দৃশ্যমান অংশ হয়ে ওঠেন।
তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ারের প্রবণতা এই ফ্যাশনকে আরও জনপ্রিয় করেছে। গন্তব্যের সঙ্গে পোশাকের মিল থাকলে ছবিও হয়ে ওঠে আলাদা।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—স্থানীয় পোশাককে শুধু ‘কস্টিউম’ হিসেবে না দেখে এর সাংস্কৃতিক অর্থ ও ব্যবহারকে সম্মান করা।
কারণ ভ্রমণ শুধু নতুন একটি জায়গায় পা রাখার নাম নয়।
কখনো একটি খাবারের স্বাদে, কখনো মানুষের আতিথেয়তায়, আবার কখনো একটি ঐতিহ্যবাহী পোশাকের রঙে—পর্যটক খুঁজে নেন একটি দেশের গল্প।
আর সেই গল্পই হয়তো ফিরে আসে স্যুটকেসে নয়—ফিরে আসে ছবিতে, স্মৃতিতে, আর ভ্রমণকারীর নিজের গল্পে।


