
Table of Contents
কুমোরটুলির সরু গলিতে এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। কারও হাতে রঙের তুলি, কেউ ব্যস্ত প্রতিমার সাজসজ্জায়, আবার কোথাও চলছে মণ্ডপ তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ। মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমায়। কয়েক দিনের মধ্যেই এই প্রতিমাগুলো ছড়িয়ে পড়বে কলকাতার অলিগলি থেকে ভারতের নানা প্রান্তের পূজামণ্ডপে।
দুর্গাপূজা মূলত ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই উৎসবের পরিসরও বদলেছে। এখন পূজা অনেকের কাছে শুধু পূজা দেখা বা অঞ্জলি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি, শিল্প, খাবার, ঐতিহ্য ও ভ্রমণের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

পূজার কয়েকটি দিনকে কেন্দ্র করে এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটে যান মানুষ। কেউ কলকাতার বিখ্যাত প্যান্ডেল দেখতে, কেউ বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যবাহী পূজা দেখতে, আবার কেউ খুঁজে নেন ভিন্ন শহরের আলাদা সংস্কৃতি ও পূজার ধরন। ফলে দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে ভারতের কালচারাল ট্যুরিজমেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

কলকাতা: পূজার শহরে প্যান্ডেল হপিং
দুর্গাপূজার কথা উঠলে প্রথমেই আসে কলকাতার নাম। শহরটির সঙ্গে দুর্গাপূজার সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প, স্থাপত্য, ইতিহাস ও বাঙালির জীবনযাপন।
কুমোরটুলি, শোভাবাজার রাজবাড়ি, বাগবাজার, কুমোরটুলি পার্ক, কলেজ স্কয়ার, সন্তোষ মিত্র স্কয়ার, একডালিয়া, শ্রীভূমিসহ ঐতিহ্যবাহী বনেদি বাড়ির পূজা থেকে দক্ষিণ কলকাতার থিম প্যান্ডেল পূজার সময়ে গোটা শহরটাই যেন বিশাল এক মুক্ত প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। কোথাও পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়, কোথাও সমকালীন শিল্পের মাধ্যমে তৈরি হয় নতুন থিম। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়; এক মণ্ডপ থেকে আরেক মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোই হয়ে ওঠে আলাদা এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা—যাকে কলকাতার ভাষায় বলা হয় প্যান্ডেল হপিং।
শুধু কলকাতার মানুষই নয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশ থেকেও পর্যটকেরা এই সময়ে শহরটিতে আসেন। কয়েক দিনের এই ভ্রমণে পূজার পাশাপাশি তারা দেখেন কলকাতার পুরনো স্থাপত্য, রাস্তার খাবার, বাজার, মিষ্টি আর শহরের নিজস্ব জীবনযাপন।
কটক: রুপার শহরে দেবীর অন্যরকম সাজ
কলকাতার বাইরে দুর্গাপূজার আরেকটি বড় আকর্ষণ ওড়িশার কটক। এখানকার পূজার বিশেষত্ব হলো রুপার ফিলিগ্রি বা তারকাসি কাজের অলংকারে দেবীর সাজ।
মণ্ডপের সাজসজ্জা ও প্রতিমার অলংকারে রুপার সূক্ষ্ম কারুকাজ ব্যবহার করা হয়। ফলে কটকের পূজা শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, স্থানীয় কারুশিল্পেরও এক অসাধারণ প্রদর্শন হয়ে ওঠে।
একজন পর্যটক এখানে শুধু দুর্গাপূজা দেখছেন না। তিনি একই সঙ্গে দেখছেন ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং শহরের ইতিহাস। এভাবেই একটি ধর্মীয় উৎসব স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করছে।

দিল্লি: রাজধানীতে বাঙালির উৎসব
দেশটির রাজধানী দিল্লিতেও দুর্গাপূজা বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বড় আয়োজন। কলকাতা থেকে হাজার মাইল দূরে হলেও পূজার সময় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় বাঙালির পরিচিত উৎসবের আবহ।
পূজামণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাচ, নাটক এবং বাঙালি খাবারের আয়োজন। ফলে দিল্লির দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।
অন্য শহরে বসবাসকারী বাঙালিদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকরাও এসব আয়োজন দেখতে আসেন। ফলে একটি শহরের ভেতরেই তৈরি হয় ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
মুম্বাই: মহানগরের বাঙালি সংস্কৃতি
বলিউড ও বাণিজ্যের শহর মুম্বাইয়েও দুর্গাপূজা ঘিরে তৈরি হয় আলাদা উৎসবের আবহ। বিভিন্ন বাঙালি সংগঠনের আয়োজনে পূজামণ্ডপে জড়ো হন বিভিন্ন পেশার মানুষ।
এখানেও পূজার সঙ্গে যুক্ত হয় খাবার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আড্ডা ও সামাজিক যোগাযোগ। মুম্বাইয়ের মতো বহুজাতিক শহরে দুর্গাপূজা তাই বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
একজন পর্যটকের জন্য এর আকর্ষণ এখানেই—একই শহরের মধ্যে দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থান।
গুয়াহাটি: উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক আবহ
আসামের গুয়াহাটিতেও দুর্গাপূজা ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের বড় আয়োজন। তবে এই অঞ্চলের পূজায় উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশেরও প্রভাব দেখা যায়।
পর্যটকেরা পূজা দেখতে এসে শুধু মণ্ডপেই আটকে থাকেন না। শহরের স্থানীয় খাবার, বাজার, সংস্কৃতি এবং আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগও তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি পূজাকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে পুরো একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা।
পূজা যখন স্থানীয় অর্থনীতিরও উৎসব
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পোশাকের দোকান, খাবারের ব্যবসা, হস্তশিল্প, স্মারকপণ্য—বিভিন্ন খাতেই তৈরি হয় বাড়তি চাহিদা।
একজন পর্যটক একটি শহরে গিয়ে শুধু মণ্ডপ দেখেন না। তিনি সেখানে থাকেন, খান, কেনাকাটা করেন, গাড়ি ব্যবহার করেন এবং স্থানীয় বিভিন্ন সেবা নেন। ফলে তার ব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি পৌঁছে যায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কারিগরদের কাছে।
এ কারণেই দুর্গাপূজাকে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবটি অনেকটাই বাদ পড়ে যায়।
ধর্মীয় উৎসব থেকে সাংস্কৃতিক ভ্রমণ
দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই, একই উৎসব বিভিন্ন শহরে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও শিল্প, কোথাও কারুশিল্প, কোথাও খাবার, আবার কোথাও প্রবাসী বাঙালির সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা।
তাই পূজার সময়ে ভারতের একটি শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে যাওয়া মানুষের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় ভ্রমণ নয়। এটি নিজের দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখারও সুযোগ।
কুমোরটুলির মাটির প্রতিমা থেকে কটকের রুপার কারুকাজ, কলকাতার প্যান্ডেল থেকে দিল্লির সাংস্কৃতিক আয়োজন—দুর্গাপূজা তাই এখন শুধু দেবী আরাধনার উৎসব নয়, ভারতের বৈচিত্র্যকে ঘুরে দেখারও এক অনন্য উপলক্ষ।






