
Table of Contents
পর্যটনের আনন্দঘন মুহূর্ত মুহূর্তেই পরিণত হলো ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। সমুদ্রের ঢেউ, নোনাজল আর অবকাশযাপনের আকর্ষণে যেখানে ছুটে যান পর্যটকেরা, সেই কক্সবাজারের ইনানীতে আগুন কেড়ে নিল ১০ প্রাণ। উখিয়ার পাটোয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে শনিবার সকালে (১৭ অক্টোবর) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সামনে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির তথ্য। এ ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটন নগরীর অন্যান্য হোটেল-রিসোর্টে আগুন মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা রয়েছে, আর কতটা নিরাপদ সেখানে রাত কাটানো পর্যটকেরা?
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম ও অগ্নিনিরাপত্তার পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। কাঠের স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে প্রবল সামুদ্রিক বাতাসও পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তোলে। তিনতলা স্থাপনাটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, আর ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। আগুন লাগার সময় অনেক পর্যটক ঘুমিয়ে ছিলেন। কেউ কেউ বাঁচার আশায় শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে মরদেহ।


অন্যান্য রিসোর্টেও আগুনের ঘটনা

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন লাগার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের গলাচিপা এলাকায় আগুনে তিনটি রিসোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে বিচ ভ্যালি ইকো রিসোর্ট পুড়ে যায়। কিংশুক ইকো রিসোর্ট ও শায়ারি ইকো রিসোর্টও ক্ষতির মুখে পড়ে। এ ছাড়া চলতি বছরের ২২ মে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের মধ্যবর্তী এলাকায় প্যাসিফিক বিচ লাউঞ্জ ইকো রিসোর্টে আগুন লাগে।
একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রের আবাসনগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। তবে এসব ঘটনার ভিত্তিতে সব হোটেল-রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা একই রকম দুর্বল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা জানতে প্রয়োজন সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই।
অগ্নিনিরাপত্তায় কী কী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন?
একটি হোটেল বা রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু দেয়ালে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ঝুলিয়ে রাখলেই চলে না। আগুনের সূত্রপাত দ্রুত শনাক্ত করা, আগুন ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা এবং অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
প্রথমত, ভবনের উপযোগী ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখতে হবে। সেগুলো কোথায় রয়েছে, কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং মেয়াদ ঠিক আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফায়ার অ্যালার্ম ও ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকলে আগুনের প্রাথমিক পর্যায়েই সতর্ক হওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, জরুরি বহির্গমন পথ এমন হতে হবে, যাতে আগুন লাগলে অতিথিরা দ্রুত ও নিরাপদে বাইরে বেরিয়ে যেতে পারেন। সিঁড়ি ও বের হওয়ার পথ বাধামুক্ত রাখা, জরুরি নির্দেশনাসংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন এবং রাতেও সহজে পথ খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা জরুরি। দরজা বন্ধ বা পথ আটকে থাকলে কিংবা আগুনে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত, বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘর ও গ্যাস ব্যবহারের জায়গাগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। হোটেল-রিসোর্টে রান্নার কাজে আগুন ও তাপ ব্যবহারের কারণে এসব স্থানে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কাঠের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কর্মীদের জরুরি উদ্ধারবিষয়ক প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। আগুন লাগলে কে অতিথিদের সতর্ক করবেন, কে বহির্গমন পথ দেখাবেন, কে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেবেন—এসব বিষয়ে আগেই পরিকল্পনা থাকা দরকার। অতিথিরা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় আগুন লাগলে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অনুমোদন ও তদারকি কতটা কার্যকর?
টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনায় শুধু অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতিই নয়, তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জুনে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১৭ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণে তৈরি অনেক রিসোর্ট প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও অনুমোদনের বিষয়টি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি।
তবে কক্সবাজারের কতটি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স রয়েছে, কতটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই কিংবা কতটি প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—এমন পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে জেলার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন ও লাইসেন্সের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত পরিদর্শন
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছেন। পর্যটনকেন্দ্রের কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি উদ্ধারবিষয়ক প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
এখন প্রয়োজন কক্সবাজারের সব হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ে সমন্বিত উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত লাইসেন্স ও অনুমোদন যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করা, জরুরি বহির্গমন পথ পরীক্ষা এবং নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করা। যেসব প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাও জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
পর্যটন শুধু সমুদ্র, পাহাড় কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনের নিশ্চয়তা। যে হোটেল বা রিসোর্টে একজন পর্যটক নিশ্চিন্তে রাত কাটাতে যাবেন, সেখানে আগুন লাগলে নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ আছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইনানীর অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু একটি রিসোর্টের দুর্ঘটনা নয়—এটি পুরো পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের জরুরি সতর্কবার্তা।


