
একসময় আকাশপথে ভ্রমণ মানেই ছিল দ্রুত এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে যাওয়া। এরপর বিমানে এলো ব্যবসা শ্রেণি, প্রথম শ্রেণি ও ব্যক্তিগত কক্ষ। কিন্তু পৃথিবীর অতি ধনীদের কাছে এসবও যেন যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য বিমান এখন আর শুধু যাতায়াতের বাহন নয়—এটি উড়ন্ত বাড়ি, আকাশের প্রাসাদ, কখনোবা কয়েকশ কোটি টাকার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য।


ভাবুন তো, বিমানের ভেতরেই যদি থাকে রাজকীয় শোবার ঘর, আলাদা খাবার ঘর, ব্যক্তিগত কার্যালয়, বৈঠকখানা, বার, বিনোদনের জায়গা কিংবা পূর্ণাঙ্গ গোসলখানা—তাহলে সেটিকে বিমান বলা যায়, নাকি আকাশে ভেসে চলা প্রাসাদ? বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল ব্যক্তিগত বিমানগুলোর অনেকগুলোই তৈরি হয়েছে বড় যাত্রীবাহী বিমানের কাঠামোর ওপর। তবে যেখানে সাধারণ বিমানে শত শত যাত্রী বসেন, সেখানে এসব বিমানে থাকেন মাত্র কয়েকজন। আর পুরো জায়গাটিই সাজানো হয় তাদের পছন্দ অনুযায়ী।

চলুন দেখে নেওয়া যাক এমনই ছয়টি বিলাসবহুল বিমান।
এয়ারবাস এ৩৮০ ‘ফ্লাইং প্যালেস’

বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী বিমানগুলোর একটি এয়ারবাস এ৩৮০। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সাজানো হলে এই বিশাল উড়োজাহাজের ভেতরের চিত্রই বদলে যায়।
সৌদি ব্যবসায়ী ও ধনকুবের প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালালের জন্য বিশেষভাবে সাজানো এ৩৮০-কে ঘিরে ‘ফ্লাইং প্যালেস’ বা ‘উড়ন্ত প্রাসাদ’ নামটি আলোচিত হয়েছে।
এ ধরনের বিমানে থাকতে পারে একাধিক বসার ঘর, খাবার ঘর, কার্যালয়, শোবার ঘর ও বিনোদনের ব্যবস্থা। এখানে বিলাসিতার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শুধু দামি আসবাব নয়, বরং বিশাল জায়গা—যেন একটি বাড়িকেই আকাশে তুলে নেওয়া হয়েছে।
বোয়িং ৭৪৭-৮ ভিআইপি

‘জাম্বো জেট’ নামে পরিচিত বোয়িং ৭৪৭-৮ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সাজালে পরিণত হয় উড়ন্ত বিলাসবহুল বাড়িতে।
বিশাল কেবিনে তৈরি করা যায় ব্যক্তিগত শোবার ঘর, কার্যালয়, বসার ঘর, খাবার ঘর ও অতিথিদের জন্য আলাদা জায়গা। মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী কাঠের নকশা, নরম আলো কিংবা আধুনিক সাজসজ্জায় পুরো কেবিনকে নিজের বাড়ির মতো করে সাজানো যায়। নতুন এই ধরনের বিমানের মূল্য কয়েকশ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার খরচ যোগ হলে অঙ্ক আরও বেড়ে যায়।অর্থাৎ, হাজার হাজার কোটি টাকার এই বিমানের বড় অংশের মূল্য শুধু উড়োজাহাজে নয়—এর ভেতরের বিলাসী পৃথিবীতেও।
বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ভিআইপি

সাধারণ যাত্রীদের কাছে পরিচিত বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের ব্যক্তিগত সংস্করণ একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়।
একটি আলোচিত ব্যক্তিগত ৭৮৭ বিমানে প্রায় ২ হাজার ৩০০ বর্গফুট কেবিনে মাত্র ৪০ জনের মতো যাত্রীর জন্য জায়গা রাখা হয়েছিল।
কেবিনে ছিল বড় শোবার ঘর, প্রশস্ত বিছানা, নিজস্ব বাথরুম ও গোসলের ব্যবস্থা, পোশাক রাখার আলাদা ঘর, বসার ঘর, খাবার ঘর এবং আধুনিক রান্নাঘর।
কিছু সময় এই ধরনের বিমানের ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া প্রায় ৭৪ হাজার ডলার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ ঘণ্টার যাত্রায় শুধু বিমান ভাড়াই প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার হতে পারে।
এখানে বিলাসিতার বড় আকর্ষণ হলো ব্যক্তিগত পরিসর—নেই অন্য যাত্রীর কোলাহল, নেই অপেক্ষার দীর্ঘ সারি। পুরো ভ্রমণটাই যেন নিজের মতো করে।
এয়ারবাস এসিজে৩৫০

এয়ারবাস এসিজে-৩৫০ ব্যক্তিগত বিমানের জগতে যেন একটি উড়ন্ত বাড়ি। এতে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০৮ বর্গমিটার পর্যন্ত কেবিনের জায়গা পাওয়া যেতে পারে। বিমানটি প্রায় ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা উড়তে সক্ষম এবং দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারে।
এই বিশাল জায়গায় থাকতে পারে আলাদা শোবার ঘর, বসার ঘর, খাবার ঘর, কার্যালয় ও বিনোদনের ব্যবস্থা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়—মালিকের পছন্দ অনুযায়ী এর অভ্যন্তরীণ নকশা করা যায়। অর্থাৎ, মাটির বাড়ির মতোই নিজের রুচি অনুযায়ী সাজানো যায় কয়েক হাজার ফুট ওপরে ভেসে চলা এই ‘বাড়ি’।
বোয়িং ৭৭৭ ‘ক্রিস্টাল স্কাই’

বোয়িং ৭৭৭-২০০এলআর-এর ব্যক্তিগত সংস্করণ ‘ক্রিস্টাল স্কাই’ একসময় বিলাসবহুল চার্টার বিমানের আলোচিত নাম ছিল।
এতে ছিল সম্পূর্ণ শোয়ার উপযোগী আসন, ব্যক্তিগত কক্ষ, বার, বসার জায়গা, অত্যাধুনিক বিনোদন ব্যবস্থা এবং বিশেষ খাবারের আয়োজন। কিছু ফ্লাইটে বিশেষজ্ঞ রাঁধুনি ও ব্যক্তিগত সেবাকর্মীর ব্যবস্থাও ছিল।
বিভিন্ন সময়ে এই বিমানের ভাড়া ঘণ্টায় প্রায় ৩৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার বা তারও বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৯ থেকে ২০ ঘণ্টার যাত্রায় মোট ব্যয় প্রায় ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত।তবে এসব পুরোনো চার্টার ব্যবস্থার মূল্য; বর্তমানে একই হারে ভাড়া পাওয়া যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এয়ারবাস এসিজে৩১৯ নিফিনিতো

ছোট আকারের ব্যক্তিগত বিমানের মধ্যেও বিলাসিতার সীমা কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তার উদাহরণ এয়ারবাস এসিজে৩১৯ নিফিনিতো।
এয়ারবাস ও ইতালীয় নকশা প্রতিষ্ঠান পাগানি অটোমোবিলির সহযোগিতায় তৈরি এই ধারণাবিমানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ভার্চুয়াল স্কাই’—কেবিনের ছাদে এমন দৃশ্য তৈরির ধারণা, যাতে বিমানের ভেতর থেকেও আকাশের অনুভূতি পাওয়া যায়।
এতে কল্পনা করা হয়েছিল সিনেমা দেখার আলাদা জায়গা, খাবার ঘর, বার ও প্রশস্ত দ্বৈত শোবার ঘর।
মূল এ৩১৯ নিও বিমানের মূল্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হলেও, ব্যক্তিগত বিমানের প্রকৃত খরচ নির্ভর করে সাজসজ্জা, প্রযুক্তি ও মালিকের চাহিদার ওপর।
এত বিলাসিতার খরচ কত?
একটি ভিআইপি বিমান কেনার পর খরচ শেষ হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অভ্যন্তরীণ নকশা, আসবাব, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, পাইলট ও কর্মীদের বেতন, বিমানবন্দর ফি, হ্যাঙ্গার এবং নিরাপত্তার খরচ।বিশেষ করে বড় আকারের ব্যক্তিগত বিমানের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণেই প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে। আর ভাড়া করে উড়তে চাইলে ঘণ্টাপ্রতি কয়েক দশ হাজার ডলার খরচ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
বিমানের প্রযুক্তি মানুষকে আকাশে তুলেছিল। আর বিশ্বের অতি ধনীদের বিলাসিতা সেই আকাশকেই বানিয়েছে ব্যক্তিগত ঠিকানা। কেউ বিমানে বসে শুধু গন্তব্যে পৌঁছান। কেউ সেখানে বসেই অফিস করেন, কেউ রাত কাটান। আবার কেউ এমনভাবে বিমান সাজান, যেন মাটি থেকে হাজার হাজার ফুট ওপরে ভেসে চলছে তাদের নিজস্ব প্রাসাদ। কারও কাছে একটি ব্যক্তিগত কক্ষই যথেষ্ট। আবার কারও কাছে পুরো একটি বোয়িং ৭৪৭ কিংবা এয়ারবাস এ৩৮০-ই যেন নিজের বাড়ির আরেকটি সংস্করণ।
আকাশে তখন শুধু যাত্রা নয়—উড়ে চলে এক টুকরো ব্যক্তিগত পৃথিবী।


