
দীর্ঘ নয় বছর পর পর্যটন কার্নিভাল ঘিরে আবারও বর্ণিল রূপে সেজেছিল পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। সমুদ্রের ঢেউ, রঙিন ঘুড়ি, শিশুদের ছবি আঁকা, সংগীতের সুর আর ফ্যাশন শো—সব মিলিয়ে দুই দিনজুড়ে উৎসবের আমেজে মুখর ছিল সাগরকন্যা। বিচ ফুটবল, বিচ ম্যারাথন, পিঠা উৎসব ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ছিল বাড়তি আকর্ষণ। তবে বর্ণিল আয়োজনের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার নানা ঘাটতি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বিশেষ করে বিচ ম্যারাথনে খাবার ও চিকিৎসাসেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।

২৩ ও ২৪ অক্টোবর, শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬’। বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। দীর্ঘ বিরতির পর এমন আয়োজন ঘিরে কুয়াকাটায় তৈরি হয় বাড়তি উৎসাহ। সৈকত ও আশপাশের পর্যটন এলাকাজুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের আনাগোনা।

প্রথম দিন লেম্বুর বনে ঘুড়ি উৎসব ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য আয়োজন। বিকেল গড়াতেই সৈকতে বাড়তে থাকে উৎসবের আমেজ। বিচ ফুটবল, ফ্যাশন শো, বাউল গান, কমেডি শো এবং শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা মাতিয়ে রাখে দর্শকদের। স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিনোদনের সমন্বয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

দ্বিতীয় দিনের শুরু হয় ভোরের বিচ ম্যারাথন দিয়ে। কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতী পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটারের এই দৌড়ে অংশ নেন দেশি-বিদেশি ও বিভিন্ন বয়সী প্রতিযোগীরা। সমুদ্রের ঢেউ আর ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল আকর্ষণীয়। কিন্তু আয়োজনের এই আনন্দের মধ্যেই সামনে আসে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ।


অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘ পথের দৌড়ে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়েও অসন্তোষ জানান কেউ কেউ। বিশেষ করে সাত কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের জন্য পথে পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকায় ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এদিকে, কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। পর্যটকের চাপে অনেক আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে যায়। তবে এই ভিড় সামলানোর প্রস্তুতি ও পর্যটকসেবার মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বিশেষ করে হোটেলকক্ষের সংকট, আবাসন ও খাবারের বাড়তি দাম এবং পরিবহন ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিপুল দর্শনার্থীর তুলনায় অনুষ্ঠানস্থলের ধারণক্ষমতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
তবে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য এমন আয়োজন নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য নতুন করে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে আয়োজনের মান ও পর্যটকসেবার ঘাটতি দূর করা জরুরি।
সব মিলিয়ে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল ছিল আনন্দ, বিনোদন ও পর্যটন সম্ভাবনার এক বর্ণিল আয়োজন। তবে বিচ ম্যারাথনে খাবার ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতির অভিযোগসহ নানা অব্যবস্থাপনা সেই সাফল্যে প্রশ্নচিহ্নও এঁকে দিয়েছে। পর্যটন কার্নিভালের সার্থকতা শুধু মানুষের ভিড় কিংবা মঞ্চের জৌলুশে নয়; বরং পর্যটক ও অংশগ্রহণকারীরা কতটা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মানসম্মত অভিজ্ঞতা পেলেন, তার ওপরই নির্ভর করে প্রকৃত সাফল্য।
কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে এমন আয়োজন নিয়মিত হলে পর্যটনশিল্পে নতুন গতি আসতে পারে। তবে আগামী আয়োজনগুলোতে পরিকল্পনা, সমন্বয়, নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই উৎসবের রঙ ছাপিয়ে কুয়াকাটা হয়ে উঠতে পারে আরও সুসংগঠিত ও পর্যটকবান্ধব গন্তব্য।


