
দিনের বেলা নীল সমুদ্র, বালুকাবেলায় ঢেউয়ের ছন্দ; আর সন্ধ্যা নামলেই বিনোদন, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নানা উৎসবের আমেজ। পর্যটকদের এমন অভিজ্ঞতা দিতেই প্রথমবারের মতো তিন মাসব্যাপী ‘কক্সবাজার পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬’ আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।
আগামী ১ নভেম্বর শুরু হয়ে এই আয়োজন চলবে ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি কক্সবাজারে তাদের অবস্থানের সময় বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
শীতের মৌসুমে কক্সবাজার মানেই সমুদ্রের টানে ছুটে চলা, প্রিয়জনের সঙ্গে সৈকতে সময় কাটানো কিংবা সূর্যাস্তের রঙে হারিয়ে যাওয়া। তবে এবার শুধু সমুদ্র দেখা নয়, ভ্রমণের আনন্দকে আরও দীর্ঘ করতে থাকছে বিশেষ আয়োজন। দিন ও রাতজুড়ে বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সৃজনশীল নানা কার্যক্রমে মুখর হয়ে উঠবে কার্নিভাল প্রাঙ্গণ।



গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কার্নিভালের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান।
তিনি জানান, বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে নতুন ও ব্যতিক্রমীভাবে তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর আকর্ষণ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই কার্নিভালের আয়োজন। তাঁর প্রত্যাশা, ছুটির মৌসুমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে সমুদ্রনগরী, তৈরি হবে নতুন অভিজ্ঞতা ও আনন্দের উপলক্ষ।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে এবং স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিচালনায় হোটেল শৈবালের সমুদ্রসৈকত ও সংলগ্ন ঝাউবনের বিস্তৃত এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে এই কার্নিভাল। সমুদ্রের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে উৎসবের আমেজ মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য জায়গাটি হয়ে উঠবে বাড়তি আকর্ষণের কেন্দ্র।
কক্সবাজারের পর্যটন শুধু সমুদ্রসৈকতে ঘোরাঘুরি কিংবা হোটেলে রাত কাটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৈকতের পাশের খাবারের দোকান, সামুদ্রিক খাবারের রেস্তোরাঁ, বার্মিজ মার্কেট, শুঁটকি ও ঝিনুকের পণ্যের দোকান—সব মিলিয়ে এখানকার ভ্রমণ যেন নানা অভিজ্ঞতার এক প্যাকেজ। আর এই পর্যটনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশ।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ১৭টি খাতে বছরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। অর্থাৎ, সৈকতে বেড়াতে আসা মানুষের ভ্রমণ যেমন আনন্দের, তেমনি তাঁদের ঘিরে তৈরি হয় স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও ব্যবসার সুযোগ।
এর আগে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টরা এক সপ্তাহে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসার সম্ভাবনা দেখেছিলেন। সে সময় কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন দেড় লাখের বেশি পর্যটকের থাকার সক্ষমতা ছিল।
এরও আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ১৫ দিনের পর্যটন মৌসুমে প্রায় ১৬ লাখ পর্যটকের আগমনের হিসাব দিয়েছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চেম্বার নেতারা। তাঁদের হিসাবে, ওই সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। এর মধ্যে হোটেল-মোটেল ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আনুমানিক ২১০ কোটি টাকা এবং প্রায় ৫০০ রেস্তোরাঁয় ৭৫ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল বলে জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো।
পর্যটন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও কম নয়। স্থানীয় হোটেল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক হোটেলগুলো থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা রাজস্ব পরিশোধ করা হয়েছিল। পরবর্তী এক অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এই খাত থেকে রাজস্ব আসে ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। একইভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে রেস্তোরাঁ খাত থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা রাজস্ব দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে কক্সবাজার শহর ও সৈকত এলাকার পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার পর্যটকের থাকার সক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শহর ও সৈকত এলাকায় রয়েছে প্রায় ৫০০ রেস্তোরাঁ।
এ ছাড়া সৈকতকেন্দ্রিক কিটকট সেবা, বিচ বাইক, ঘোড়ায় চড়া, ফটোগ্রাফি, জেটস্কি ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ। পর্যটকদের কেনাকাটার আকর্ষণ বার্মিজ মার্কেট, শুঁটকি, ঝিনুক ও মুক্তার পণ্যের ব্যবসাও এই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে তার প্রভাব পড়ে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সেবাদাতাদের ওপরও।
তবে এত আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না বলে মনে করছে পর্যটন করপোরেশন। সংস্থাটির চেয়ারম্যানের ভাষ্য, পর্যটকদের অন্যতম অভিযোগ হলো, দিনের বেলায় সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের পর সন্ধ্যায় বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে পর্যটকদের জন্য দিন-রাতজুড়ে উপভোগের সুযোগ তৈরি করতেই তিন মাসব্যাপী কার্নিভালের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কক্সবাজারের পরিচিত সৌন্দর্যকে নতুন অভিজ্ঞতায় সাজিয়ে তোলার এই উদ্যোগ কতটা সাড়া ফেলবে, তা জানা যাবে আয়োজন শুরু হলে। তবে পরিকল্পনা সফল হলে সমুদ্রের ঢেউ, ঝাউবনের ছায়া আর সূর্যাস্তের মায়ার সঙ্গে যুক্ত হবে উৎসবের বাড়তি আনন্দ। তখন কক্সবাজার শুধু এক দিনের সৈকতভ্রমণ নয়, বরং কয়েক দিন ধরে ঘুরে দেখা, উপভোগ করা আর নতুন স্মৃতি নিয়ে ফেরার গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।


