
Table of Contents
সমুদ্রের নীল জলরাশি, বিলাসবহুল রিসোর্ট আর বিশ্বমানের আতিথেয়তার জন্য পরিচিত মালদ্বীপ। সেই দেশের রাজধানী মালে শহরে যখন এক ছাদের নিচে মিলিত হন দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পের প্রতিনিধিরা। এমন আবহে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সাউথ এশিয়ান ট্রাভেল অ্যাওয়ার্ডস’ (SATA) ২০২৬-এর দশম আসরের গালা ডিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
৮ অক্টোবর বার্সেলো নাসান্ধুরা মালে হোটেলে বসে এবারের জমকালো আয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন, ভ্রমণ ও আতিথেয়তা খাতের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের কাজের স্বীকৃতি দিতে ৫৪টি বিভাগে দেওয়া হয় মোট ১৭৮টি পুরস্কার। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই আয়োজনের এক দশক পূর্তিতে এবারের আসর পেয়েছে বিশেষ তাৎপর্য।

পুরস্কারের তালিকায় এগিয়ে মালদ্বীপ

এবারের আয়োজনে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছে স্বাগতিক মালদ্বীপ। দেশটির হোটেল, রিসোর্ট, পর্যটনসেবা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়ে অর্জন করেছে ৩৬টি পুরস্কার। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘ফেস অব সাউথ এশিয়া’ সম্মাননা পেয়েছেন দামাস সোলিহ। মালদ্বীপের পর্যটন উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয় এ পুরস্কার। তিনি মালদ্বীপ ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে মালদ্বীপ। ‘লিডিং অ্যাডভেঞ্চার ডেস্টিনেশন’ বিভাগে আবারও পুরস্কার পেয়েছে দেশটি। এ ছাড়া দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থা মালদিভিয়ান এবং ট্রান্স মালদিভিয়ান এয়ারওয়েজ পেয়েছে পরিবহনসেবাসংশ্লিষ্ট স্বীকৃতি। সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটনের জনপ্রিয়তাও উঠে এসেছে পুরস্কারের তালিকায়। ‘মালদিভস লেজেন্ড এক্স’ পেয়েছে লিভঅ্যাবোর্ড বিভাগে সম্মাননা। পাশাপাশি বিচ রিসোর্ট, ডাইভিং, সার্ফিং, রোমান্টিক অবকাশ এবং বিলাসবহুল আতিথেয়তার বিভিন্ন বিভাগেও পুরস্কার পেয়েছে দেশটির একাধিক প্রতিষ্ঠান।
শ্রীলঙ্কার প্রকৃতি ও ঐতিহ্যনির্ভর পর্যটনের স্বীকৃতি
দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রে শ্রীলঙ্কার অন্যতম শক্তি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সমুদ্র ও পাহাড়ঘেরা অবকাশযাপন। SATA ২০২৬-এ দেশটির ‘আমায়া লেক, দাম্বুলা’ পেয়েছে ‘লিডিং রিভারফ্রন্ট হোটেল/রিসোর্ট’ বিভাগে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড।
কান্দালামা লেকের পাশে সবুজ প্রকৃতির মধ্যে অবস্থিত রিসোর্টটি প্রকৃতিনির্ভর অবকাশযাপনের জন্য পরিচিত। এর স্বীকৃতি দক্ষিণ এশিয়ায় এমন পর্যটন অভিজ্ঞতার গুরুত্বও তুলে ধরে, যেখানে বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার আকর্ষণ রয়েছে। একই বিভাগে সিলভার স্বীকৃতি পেয়েছে ভারতের বিবান্তা একতা নগর, নেপালের সিদ্ধার্থ রিভারসাইড রিসোর্ট এবং ভুটানের লে মেরিডিয়ান পারো, রিভারফ্রন্টসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
নেপালের হোটেলশিল্পেও সাফল্য
পর্বত, ট্রেকিং ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত নেপালও এবারের আয়োজনে নিজেদের আতিথেয়তা খাতের সক্ষমতা তুলে ধরেছে। দেশটির ‘বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস কাঠমান্ডু হোটেল’ পেয়েছে ‘লিডিং এয়ারপোর্ট হোটেল’ বিভাগে সিলভার অ্যাওয়ার্ড।
৮ অক্টোবরের অনুষ্ঠানে শ্রীলঙ্কার মালদ্বীপে নিযুক্ত হাইকমিশনার মোহাম্মদ রিজভি হাসেন হোটেলটির জেনারেল ম্যানেজার আশিস পান্তের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান, ব্যবসায়িক ও অবকাশযাপনকারী অতিথিদের সুবিধা এবং মানসম্মত সেবার মতো বিষয়গুলো এ ধরনের হোটেলের গুরুত্ব তুলে ধরে।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জন
আঞ্চলিক এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হোটেল ও আতিথেয়তা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও রেখেছে সাফল্যের স্বাক্ষর। সায়েমান পেয়েছে একাধিক স্বীকৃতি। প্লাটিনাম রেসিডেন্স বাই শেলটেক, র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন এবং ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানও বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে।
বাংলাদেশের এসব অর্জন দেশের হোটেলশিল্পের সেবার মান, ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক আতিথেয়তা এবং পর্যটন বিপণনের ক্ষেত্রে অগ্রগতির দিকটি সামনে আনে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন স্বীকৃতি বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের কাছে দেশের আতিথেয়তা খাতকে পরিচিত করে তোলার সুযোগও তৈরি করে।
এদিকে, ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম প্লাটিনাম হোটেলস বাই শেলটেকের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার মো. আলমগীর হোসান। তিনি ‘সাউথ এশিয়াস বেস্ট জেনারেল ম্যানেজার’ পুরস্কার পেয়েছেন। হোটেল পরিচালনা, অতিথিসেবার মানোন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় তাঁর অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে এ অর্জনকে দেখা হচ্ছে।
এক দশকে আঞ্চলিক পর্যটনের স্বীকৃতিমঞ্চ
SATA-এর দশ বছরের পথচলা দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটনশিল্পের ক্রমবর্ধমান বৈচিত্র্যকেও তুলে ধরে। একদিকে মালদ্বীপের সমুদ্র ও বিলাসবহুল রিসোর্ট, অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার প্রকৃতিনির্ভর অবকাশ, নেপালের পর্বতকেন্দ্রিক পর্যটন, ভুটানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভারতের বিস্তৃত হোটেলশিল্প—সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা বহুমাত্রিক।
এ ধরনের পুরস্কার আয়োজনের মূল্য কেবল বিজয়ীদের নাম ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। হোটেল পরিচালনা, পরিবহন, ভ্রমণসেবা, অতিথি অভিজ্ঞতা, উদ্ভাবন ও টেকসই পর্যটনের মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনে এটি শিল্পসংশ্লিষ্টদের জন্য অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে।
ভ্রমণকারীর কাছে একটি গন্তব্যের আকর্ষণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ সেখানে পৌঁছানোর সুবিধা, নিরাপদ আবাসন, আন্তরিক সেবা এবং নতুন অভিজ্ঞতা। SATA ২০২৬-এর মঞ্চে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্জন তাই শুধু প্রতিযোগিতার ফল নয়; বরং পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ, প্রতিযোগিতামূলক ও অভিজ্ঞতানির্ভর করে তোলার সম্মিলিত প্রচেষ্টারও প্রতিচ্ছবি।




