
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যের অনন্য আধার সুন্দরবন। এই বনকে সুরক্ষিত রেখেই উপকূলীয় মানুষের জীবিকা ও পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা এগিয়ে নিতে চান স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তবে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার পরিবেশবান্ধব পর্যটন উদ্যোগ। এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবন রক্ষা, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং টেকসই ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে খোলা চিঠি দিয়েছেন প্রান্তিক পর্যটন উদ্যোক্তারা।
একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনা সরেজমিনে দেখতে প্রধানমন্ত্রীকে সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলো পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তারা।


শনিবার ‘রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন’-এর সেক্রেটারি ও ‘জংগলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন শাওন স্বাক্ষরিত ওই খোলা চিঠিতে এসব দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়।

চিঠিতে উদ্যোক্তারা জানান, খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ও কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১৭ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে উঠেছে ১৫টি পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৫৩ জনের মধ্যে ১৩৫ জনই স্থানীয় বাসিন্দা। ফলে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ।
রিসোর্টকেন্দ্রিক এই উদ্যোগের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। পর্যটকদের যাতায়াত ও সেবার চাহিদাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বোট সার্ভিস, স্থানীয় দোকান, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ ও খামারসহ আরও ৫৮টি ক্ষুদ্র ব্যবসা। উদ্যোক্তাদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ৭ হাজার ৩০০ মানুষের জীবন-জীবিকা।
তাদের মতে, বিকল্প এই কর্মসংস্থানের সুযোগ স্থানীয় মানুষের সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থকে যুক্ত করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করেছেন, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নে তারা কোনো আপস করতে চান না। বরং প্রচলিত আইন ও পরিবেশগত শর্ত মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করতে আগ্রহী তারা। এ জন্য সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজমের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং বিদ্যমান বিনিয়োগগুলো আইনসম্মত ও স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে চিঠিতে বলা হয়, নীতিমালার বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান সরেজমিনে দেখতে সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলো পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমন্বিত করে টেকসই পর্যটনের একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত গড়ে তোলার পথও উন্মুক্ত হতে পারে।
সুন্দরবনের সুরক্ষা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন, জীবিকা—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের। তাদের আশা, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পেলে সুন্দরবনকে অক্ষত রেখেই বিকশিত হতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প, তৈরি হতে পারে স্থানীয় মানুষের জন্য আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ।


