
Table of Contents
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নিরাপত্তার সংকট এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক বিঘ্ন। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময় বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ। জেদ্দা ও দাম্মামের বিমানবন্দরেও বাতিল হয়েছে একাধিক ফ্লাইট। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে একের পর এক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট স্থগিত করায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো যাত্রী। প্রভাব পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ব্যবস্থাতেও।
১২ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমান চলাচলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এখন আর শুধু একটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে।


রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ, জেদ্দা-দাম্মামেও বিঘ্ন
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর নিরাপত্তা ও স্থাপনাগুলোর কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত পুনরায় ফ্লাইট চালুর নির্দিষ্ট সময় জানায়নি দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ফ্লাইট বাতিলের তথ্য পাওয়া গেছে।
অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান Cirium-এর তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে নির্ধারিত ৩৫৪টি ফ্লাইটের মধ্যে ৩৫৩টিই বাতিল হয় অথবা পরিচালিত হয়নি। একই দিন সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে নির্ধারিত ১ হাজার ৯৬টি ফ্লাইটের মধ্যে ৬২৩টি বাতিল হয় বা পরিচালিত হয়নি। অর্থাৎ, এক দিনেই দেশটির বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়।
ঢাকায় আটকা পাঁচ হাজারের বেশি যাত্রী
সৌদি আরবের বিমান চলাচলে এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত টানা তিন দিনে ঢাকা থেকে রিয়াদ ও জেদ্দাগামী অর্ধশত টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে আটকা পড়েছেন ৫ হাজারের বেশি যাত্রী।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী, ওমরাহযাত্রী ও অন্যান্য ভ্রমণকারীর যোগাযোগ থাকায় এই পরিস্থিতি তাদের জন্য বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারা, ভিসা বা আবাসনের মেয়াদ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং নতুন করে টিকিট বুকিংয়ের মতো সমস্যায় পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা। তবে এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।
ট্রানজিট যাত্রায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে সৌদি আরব শুধু একটি গন্তব্য নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামকে কেন্দ্র করে পরিচালিত ফ্লাইটের সময়সূচি বদলে গেলে সংশ্লিষ্ট রুটের যাত্রীদের পাশাপাশি সংযোগকারী ফ্লাইটের ওপর নির্ভরশীল যাত্রীরাও সমস্যায় পড়তে পারেন।
বিশেষ করে, কোনো যাত্রী একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবে পৌঁছে সেখান থেকে অন্য গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে প্রথম ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার কারণে পরবর্তী ফ্লাইট ধরতে না-ও পারেন। পৃথক টিকিটে ভ্রমণ করলে নতুন টিকিট কেনা, অতিরিক্ত হোটেল খরচ এবং লাগেজ ব্যবস্থাপনার মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে। তবে সব ট্রানজিট যাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে, এমন নয়; কোন রুট চালু আছে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ওপর।

চাপে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিঘ্নের কারণে শুধু দেশটির নিজস্ব বিমান পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকেও ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। সৌদিয়া এয়ারলাইন্স, এমিরেটস, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই ও এয়ার অ্যারাবিয়ার মতো আঞ্চলিক পরিবহন সংস্থার একাধিক ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। লুফথানসা গ্রুপ রিয়াদগামী সব ফ্লাইট ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করেছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএমও রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে পরিচালিত ফ্লাইট স্থগিত রাখার সময় বাড়িয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে এয়ারলাইন্সগুলোকে একদিকে যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে বাতিল টিকিটের অর্থ ফেরত, বিকল্প ফ্লাইট, যাত্রীদের পুনরায় বুকিং এবং উড়োজাহাজের সময়সূচি সমন্বয়ের মতো চাপ সামলাতে হয়। ফ্লাইট বাতিল হলে উড়োজাহাজ ও কর্মীদের নির্ধারিত ব্যবহারের পরিকল্পনাও বদলে যায়। ফলে একটি রুটে তৈরি হওয়া সংকট অন্য রুটের সময়সূচিকেও প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রতিটি এয়ারলাইন্সের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি—ইএএসএ ১১ অক্টোবর সৌদি আরবের আকাশসীমার যেসব এলাকায় উড্ডয়ন না করার পরামর্শ দিয়েছে, তার পরিধি বাড়ানোর কথা জানায়। সংস্থাটির সতর্কতায় হুথিদের আরও গভীরে হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে।
এ ধরনের সতর্কতা বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর রুট পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে হলে কিছু ফ্লাইটকে বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। এতে উড্ডয়নের সময়, জ্বালানি খরচ ও পরিচালন ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ফ্লাইটের রুট কতটা পরিবর্তিত হয়েছে বা কতটা অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের তথ্য ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
অর্থনীতিতে পড়তে পারে প্রভাব
বিমান চলাচলের সংকটের প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকে না। পর্যটন, হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সেবাও এর প্রভাবে পড়তে পারে। বিশেষ করে, যেসব যাত্রী ভ্রমণের জন্য আগাম হোটেল, পরিবহন কিংবা অন্যান্য সেবা বুক করেছেন, তাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ওমরাহযাত্রীদের চলাচলও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফ্লাইট বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে যাত্রা পিছিয়ে গেলে হোটেল বুকিং, স্থানীয় পরিবহন ও অন্যান্য ভ্রমণসেবার সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।
কতটা দীর্ঘ হতে পারে এই সংকট?
বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়িত্ব নির্ভর করছে হামলার ঝুঁকি, বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা যাচাই, সৌদি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সংস্থাগুলোর পরবর্তী নির্দেশনার ওপর। রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালু করার নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা না করায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। একই সঙ্গে জেদ্দা ও দাম্মামের ফ্লাইট পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বিমানবন্দর বন্ধ থাকা, নির্দিষ্ট রুটে ফ্লাইট বাতিল এবং পুরো দেশের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে তাই বিমানবন্দর, এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পৃথক ঘোষণা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সামনে করণীয়
এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের ওয়েবসাইট বা হেল্পলাইনে ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। ট্রানজিট যাত্রীদের সংযোগকারী ফ্লাইটের সময়সূচি এবং টিকিটের শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। ফ্লাইট বাতিল হলে রিফান্ড, পুনরায় বুকিং কিংবা বিকল্প রুটের বিষয়ে এয়ারলাইন্স বা অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
সব মিলিয়ে হুথি হামলার জেরে সৌদি আরবের বিমান চলাচলে তৈরি হওয়া অস্থিরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত হওয়া, শত শত ফ্লাইট বাতিল এবং হাজারো যাত্রীর আটকে পড়া দেখিয়ে দিচ্ছে আধুনিক আকাশপথের যোগাযোগ কতটা পরস্পরনির্ভর। সংকট দীর্ঘায়িত হলে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি এয়ারলাইন্সের পরিচালন ব্যয় ও আঞ্চলিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।




