
Table of Contents
কক্সবাজারের নীল জলরাশির পাশে অবকাশযাপনের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো ভয়াবহ শোকে। উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে প্রাণ গেছে ১০ জনের। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। অথচ অগ্নিকাণ্ডের আগেই রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। প্রয়োজনীয় ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকত এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে তিনতলা কাঠের রিসোর্টটি দ্রুত পুড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। পরে রিসোর্টের ভেতর থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় ১০ জনের মরদেহ। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু

এই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা একই পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যু। পরিবারটির মোট নয়জনের কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার কথা জানা গেছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার আগেই আগুন কেড়ে নেয় পরিবারের ছয় সদস্যের প্রাণ। পরিবারের দুজন সে সময় সৈকতে বেড়াতে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান। আরেকজন রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে গেলেও আহত হন ।
পরিবারটির জন্য অবকাশযাপনের এই সফর যে এমন মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি। স্বজনদের কাছে এখন আনন্দময় ভ্রমণের স্মৃতির বদলে রয়ে গেছে হারানোর বেদনা। একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু এই দুর্ঘটনাকে আরও শোকাবহ করে তুলেছে।

আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদের বক্তব্য অনুযায়ী, টুপটুপ রিসোর্টের ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর রিসোর্টটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নোটিশ দেওয়ার পর পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর করা হয়েছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি বলছেন স্থানীয়রা।

কাঠের স্থাপনায় দ্রুত ছড়ায় আগুন
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তিনতলা কাঠের রিসোর্টটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, রান্নার সরঞ্জাম কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
এ ধরনের স্থাপনায় আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সে কারণে জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, সতর্কসংকেত এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ বের হওয়ার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিসোর্টটিতে এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, আগুন লাগার পর পর্যটকেরা সহজে বের হতে পেরেছিলেন কি না এবং উদ্ধারকাজে কোনো বাধা তৈরি হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরতে সেখানে যান বিপুলসংখ্যক পর্যটক। তাঁদের থাকার জন্য গড়ে উঠেছে নানা ধরনের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে টুপটুপ রিসোর্টের এই দুর্ঘটনা।
বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে আবাসনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের চাপ বাড়ে। এ সময় প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাই, নিয়মিত পরিদর্শন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং কর্মীদের জরুরি উদ্ধার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং আগের সতর্কবার্তার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়। একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনা কক্সবাজারের অন্যান্য হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। ১০ জনের প্রাণহানির এই ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।


